পিকেএসএফ: সোসাইটি ফর ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভস (এসডিআই) প্রতিষ্ঠার অনুপ্রেরণা এবং পেছনের গল্পটি কী ছিল?

সামছুল হক: মানুষের কল্যাণে কাজ করার তাগিদ আমার কিশোর বয়স থেকেই। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বয়স ১৪ বছর, সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি। আমার বড় ভাই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা এবং আমাদের গ্রামের বাড়িটি মুক্তিযোদ্ধাদের একটি অপারেশন হাব হিসেবে ব্যবহৃত হতো। তাঁদের খাবারের ব্যবস্থা করতে আমরা পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে চাল, ডাল, মরিচ, লবণসহ প্রয়োজনীয় জিনিস সংগ্রহ করতাম। সেই বয়সেই মানুষের জন্য সম্মিলিতভাবে কাজ করার যে অভিজ্ঞতা হয়েছিল, তা আমার মনে গভীর প্রভাব ফেলে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৩ সালে কয়েকজন তরুণকে সঙ্গে নিয়ে ‘সুখী ঘর’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলি। স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবারকল্যাণ নিয়ে কাজ শুরু করি। একটি দাতা সংস্থার কাছে প্রকল্প প্রস্তাবও দিয়েছিলাম। তারা অর্থায়নে আগ্রহী হলেও তখন আমার বয়স ১৮ বছর না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত সেই অর্থায়ন পাওয়া যায়নি।

এরপর সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ততা আরও বাড়তে থাকে। ১৯৭৮ সালে ‘সামাজিক গবেষণাগার’ নামে আশা’র একটি উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হই। ছাত্রজীবনে আশায় স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করি এবং ১৯৮১ সালে পড়াশোনা শেষ করে সেখানে স্থায়ীভাবে কাজ শুরু করি। এই সময় উন্নয়ন কার্যক্রম সম্পর্কে আমার অভিজ্ঞতা ও ধারণা আরও সমৃদ্ধ হয়।

দীর্ঘদিনের সেই অভিজ্ঞতা থেকেই ১৯৯৩ সালে আমার নেতৃত্বে সোসাইটি ফর ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভস (এসডিআই)-এর যাত্রা শুরু হয়। প্রথম দিকে স্বেচ্ছাভিত্তিকভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করি। ১৯৯৫ সালে AusAID, Australia থেকে এসডিআই প্রথম বৈদেশিক অর্থায়ন পায়। পরে আরও উন্নয়ন অংশীদারের সহযোগিতা আসে এবং ১৯৯৭ সালে এসডিআই পিকেএসএফ-এর সহযোগী সংস্থা হিসেবে যুক্ত হয়। এরপর ধীরে ধীরে আমাদের কাজের পরিধি বিস্তৃত হতে থাকে। বর্তমানে এসডিআই দেশের পাঁচটি বিভাগের ২৪টি জেলায় বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

পিকেএসএফ: তিন দশকের পথচলায় এসডিআই-এর সবচেয়ে বড় অর্জন কী?

সামছুল হক: আমাদের অনেক অর্জন রয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় অর্জন কোনো পরিসংখ্যান নয়, মানুষের বিশ্বাস অর্জন। একটি ছোট উদ্যোগ হিসেবে যাত্রা শুরু করে আজ আমরা দেশের বিভিন্ন জেলায় কাজ করছি। এই সময়ে ক্ষুদ্রঋণকেন্দ্রিক কার্যক্রমকে ধীরে ধীরে একটি সমন্বিত উন্নয়ন ধারায় নিয়ে যেতে পেরেছি।

আমরা বুঝেছি, শুধু অর্থায়ন দিয়ে মানুষের জীবনে টেকসই পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। অর্থায়নের সঙ্গে দক্ষতা, কর্মসংস্থান, বাজারসংযোগ ও সামাজিক উন্নয়নের সুযোগও প্রয়োজন। আমাদের কার্যক্রমের মাধ্যমে অনেক পরিবার আয় বাড়িয়েছে, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছে, নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বেড়েছে এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

পিকেএসএফ:উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনায় এসডিআই কোন দর্শনকে গুরুত্ব দেয়?

সামছুল হক: আমাদের কাছে উন্নয়ন মানে শুধু অর্থনৈতিক অগ্রগতি নয়, মানুষের সার্বিক সক্ষমতা বৃদ্ধি। এই দর্শন থেকেই আমরা Integrated Development Model অনুসরণ করি, যেখানে অর্থায়নের পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়ন, কৃষি, প্রাণিসম্পদ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও বাজারসংযোগকে সমন্বিতভাবে যুক্ত করা হয়েছে। আমরা চাই, প্রয়োজনীয় জ্ঞান, দক্ষতা, অর্থায়ন ও বাজারের সুযোগ কাজে লাগিয়ে একজন মানুষ নিজের উন্নয়নের চালিকাশক্তি হয়ে উঠুক এবং তার এই অগ্রগতি পরিবার ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনুক।

পিকেএসএফ: ক্ষুদ্রঋণের বাইরে জীবিকায়ন, দক্ষতা ও ভ্যালু চেইন উন্নয়নে কীভাবে কাজ করছেন?

সামছুল হক: ক্ষুদ্রঋণ গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শুধু পুঁজি দিলেই মানুষের জীবনে টেকসই পরিবর্তন আসে না। এর সঙ্গে প্রয়োজন দক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও বাজারে প্রবেশের সুযোগ। তাই আমরা জীবিকাভিত্তিক প্রশিক্ষণ, আধুনিক কৃষি, প্রাণিসম্পদ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উন্নয়নের পাশাপাশি পণ্যের মানোন্নয়ন, ব্র্যান্ডিং ও বাজারসংযোগসহ পুরো ভ্যালু চেইন নিয়ে কাজ করছি। Creative Economy-এর মাধ্যমে স্থানীয় পণ্যের পরিচিতি ও বাজার সম্প্রসারণেও গুরুত্ব দিচ্ছি। আমাদের লক্ষ্য ঋণগ্রহীতাকে সফল উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা, যাতে তিনি নিজের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থানও সৃষ্টি করতে পারেন।

পিকেএসএফ: জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় এসডিআই কীভাবে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা বাড়াচ্ছে?

সামছুল হক: জলবায়ু অভিযোজন এখন উন্নয়ন কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই এসডিআই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি, নিরাপদ ও টেকসই জীবিকা এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারে গুরুত্ব দিচ্ছে। পাশাপাশি দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারে স্থানীয় মানুষকে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে।

আমার অভিজ্ঞতায়, মানুষ প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা পেলে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পারেন। তাই শুধু সহায়তা দেওয়া নয়, ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় স্থানীয় জনগোষ্ঠী যেন নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিতে ও নেতৃত্ব দিতে পারে, সেই সক্ষমতা তৈরি করাই আমাদের লক্ষ্য।

পিকেএসএফ:এসডিআই জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (SDGs) অর্জনে কীভাবে অবদান রাখছে?

সামছুল হক: এসডিজি কোনো একটি প্রতিষ্ঠান বা খাতের একক দায়িত্ব নয়। সরকার, উন্নয়ন সংস্থা, বেসরকারি খাত ও জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই এসব লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। এসডিআই-এর বিভিন্ন কার্যক্রম দারিদ্র্য বিমোচন, খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নারী ক্ষমতায়ন, কর্মসংস্থান এবং জলবায়ু অভিযোজনসহ একাধিক এসডিজির সঙ্গে সম্পর্কিত। অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমরা মানুষের সামগ্রিক জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছি।

আমাদের কাছে এসডিজি শুধু বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা নয়। মানুষের জীবনকে আরও নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই করে তোলার যে প্রচেষ্টা, তার সঙ্গেই আমরা এসডিজিকে যুক্ত করে দেখি।

পিকেএসএফ: প্রযুক্তি ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কার্যক্রমে কী ধরনের পরিবর্তন আনছেন?

সামছুল হক: প্রযুক্তিকে আমরা মানুষের কাছে দ্রুত, স্বচ্ছ ও কার্যকরভাবে সেবা পৌঁছে দেওয়ার একটি মাধ্যম হিসেবে দেখি। এসডিআই-এর কার্যক্রমে Digital MIS, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ডিজিটাল মনিটরিং ও আধুনিক রিপোর্টিং ব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে মাঠপর্যায়ের তথ্য দ্রুত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়েছে।

তবে প্রযুক্তিকে আমরা কখনো মানুষের বিকল্প হিসেবে দেখি না। প্রযুক্তি মানুষের সক্ষমতাকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর একটি উপায়। তাই ডিজিটাল রূপান্তরের পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধ ও মানুষের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়েই আমরা এগোতে চাই।

পিকেএসএফ: ক্ষুদ্রঋণের পাশাপাশি সামাজিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?

সামছুল হক: সামাজিক উন্নয়নের বড় চ্যালেঞ্জ হলো মানুষের জীবনে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তন আনা। অবকাঠামো তৈরি করা তুলনামূলক সহজ, কিন্তু মানুষের অভ্যাস, আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনতে সময় লাগে।

স্বাস্থ্যবিধি, শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন কিংবা পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনের মতো বিষয় একদিনে প্রতিষ্ঠিত হয় না। এর জন্য ধারাবাহিক সচেতনতা এবং মানুষের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পৃক্ততা প্রয়োজন। আবার দেশের একেক অঞ্চলের বাস্তবতা ও চাহিদাও ভিন্ন। তাই একই পদ্ধতি সব জায়গায় সমানভাবে কার্যকর হয় না।

দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। তবে মানুষকে যদি শুধু সুবিধাভোগী হিসেবে না দেখে উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে যুক্ত করা যায়, তাহলে পরিবর্তন ধীরে হলেও তা স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।

পিকেএসএফ: আগামী পাঁচ বছরে এসডিআই-এর কৌশলগত অগ্রাধিকার ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

সামছুল হক: আগামী পাঁচ বছরে আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার হবে সমন্বিত উন্নয়ন মডেলকে আরও শক্তিশালী করা। অর্থায়নের সঙ্গে কৃষি, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, দক্ষতা এবং বাজারসংযোগকে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করতে চাই। ডিজিটাল রূপান্তরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে সেবার মান, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা উন্নত করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে যুব ও নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন, জলবায়ু সহনশীল কার্যক্রম, গবেষণা ও উদ্ভাবন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দেওয়া হবে।

পিকেএসএফ:  এসডিআই-এর দীর্ঘ পথচলায় পিকেএসএফ-এর অংশীদারিত্ব কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল?

সামছুল হক: প্রায় তিন দশক ধরে আমরা পিকেএসএফ-এর সহযোগী সংস্থা হিসেবে কাজ করছি। এসডিআই আজ যে অবস্থানে এসেছে, সেখানে এই দীর্ঘ অংশীদারিত্বের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পিকেএসএফ শুধু অর্থায়নই করেনি, কারিগরি সহায়তা, নীতিগত দিকনির্দেশনা এবং বিভিন্ন উদ্ভাবনী প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ দিয়ে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করেছে। এর মাধ্যমে দক্ষতা ও জীবিকা উন্নয়ন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং জলবায়ু অভিযোজনসহ নতুন নতুন ক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতা হয়েছে। একই সঙ্গে সুশাসন ও ঋণ ব্যবস্থাপনাসহ আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনাও শক্তিশালী হয়েছে।

পিকেএসএফ:  নতুন প্রজন্মের উন্নয়নকর্মী ও উদ্যোক্তাদের জন্য আপনার বার্তা কী?

সামছুল হক: নতুন প্রজন্মের প্রতি আমার অনেক প্রত্যাশা। তরুণদের উদ্ভাবনী চিন্তা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং পরিবর্তন আনার আগ্রহ বাংলাদেশের জন্য বড় শক্তি।

আমি তরুণদের বলব, শুধু একটি ভালো পেশা নয়, একটি ভালো উদ্দেশ্যও বেছে নিন। সততা, মানবিক মূল্যবোধ ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে আপস করবেন না। প্রযুক্তিকে গ্রহণ করুন, নতুন কিছু শেখার আগ্রহ ধরে রাখুন এবং স্থানীয় সমস্যার কার্যকর সমাধান খুঁজুন।

গবেষণা ও উদ্ভাবনের প্রতিও গুরুত্ব দিতে হবে। নতুন ধারণা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে ব্যর্থতা আসতে পারে, কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা থেকেও শেখার আছে। পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিতে হলে শেখার প্রক্রিয়াটি কখনো থামানো যাবে না। জ্ঞান, সততা, মানবিকতা ও সেবার মানসিকতা নিয়ে নতুন প্রজন্ম এগিয়ে এলে একটি আরও সমৃদ্ধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।

 পিকেএসএফ: আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ

সামছুল হক: আপনাকে এবং পিকেএসএফ-কেও ধন্যবাদ ।