পিকেএসএফ পরিক্রমা-এর অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০২৫ সংখ্যার জন্য

মো. আজাদুল কবির আরজু, নির্বাহী পরিচালক, জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশন (জেসিএফ)-এর সাক্ষাৎকার

মো. আজাদুল কবির আরজু-এর নেতৃত্বে ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সুপরিচিত বেসরকারি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান ‘জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশন (জেসিএফ)’ প্রতিষ্ঠিত হয়। চলতি বছর সংস্থাটি সুবর্ণ জয়ন্তী উৎসব উদযাপন করছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিগত প্রায় ৫০ বছর যাবত তিনি প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পিকেএসএফ-এর কার্যক্রম শুরুর প্রথম দিকেই, ১৯৯০ সালে ‘জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশন’ সহযোগী সংস্থা হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়। বর্তমানে সংস্থাটি ৩৬৯টি উপজেলার ৮৪১টি শাখার মাধ্যমে বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সংস্থার কার্যক্রমভুক্ত পরিবার সংখ্যা প্রায় সাড়ে ১০ লক্ষ।

মো. আজাদুল কবির আরজু’র বলিষ্ঠ নেতৃত্বে ‘জেসিএফ’ জাতীয় পর্যায়ে একটি অনন্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। ‘জেসিএফ’-এর প্রতিষ্ঠা এবং সাফল্যে তার নেতৃত্বের ভূমিকা তরুণ উন্নয়ন কর্মীদের জন্য অনুপ্রেরণামূলক। ‘পিকেএসএফ পরিক্রমা’র জন্য জনাব আরজু’র সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন মোহাম্মদ মিনহাজ উদ্দিন শেখ, সহকারী মহাব্যবস্থাপক, পিকেএসএফ; সহায়তায় মো: আজিজুল হক, ডিরেক্টর এবং মো. ইমতিয়াজ হায়দার, সিনিয়র ম্যানেজার, জেসিএফ।

 

পিকেএসএফ: জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার পেছনে আপনার মূল উদ্দেশ্য বা অনুপ্রেরণা কি ছিল?

মো. আজাদুল কবির আরজু: ১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ সালের দিকে, যুদ্ধবিধ্বস্ত সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ, যেখানে চারদিকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের করাল গ্রাস। এই দারিদ্র্য কেবল আর্থিক নয়, জ্ঞান, অনুভূতি ও দর্শনের সাথেও সম্পর্কিত। সেই পরিস্থিতিতে ১৯৭৪ সালে দেশ দুর্ভিক্ষের সম্মুখীন হয়। ১৯৭৫ সালে আমি এবং যশোর অঞ্চলে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেওয়া আমার মতই আদর্শবাদী কিছু তরুণ মুক্তিযোদ্ধা ভাবলাম, দেশে চলমান এই সমস্যার মূলোৎপাটনে আমাদের এগিয়ে আসতে হবে। পরবর্তীতে বহু বিতর্ক ও আলোচনার মধ্য দিয়ে সিদ্ধান্ত হয় জনগণের জাগরণের পথে যাত্রা শুরু করার, প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে। আর এভাবেই ‘জাগরণী চক্র’ নামে সংগঠনের যাত্রা শুরু। মূলত মানুষের মধ্যে জ্ঞান ও সচেতনতার আলো জ্বালিয়ে তাদের আর্থ-সামাজিক মুক্তির পথ দেখানোই ছিল আমাদের মূল অনুপ্রেরণা।

 

পিকেএসএফ: জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশন-এর প্রতিষ্ঠাসহ বিগত ৫০ বছরে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম বাস্তবায়নে আপনারা কি ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছেন? এবং তা কিভাবে মোকাবিলা করেছেন?

মো. আজাদুল কবির আরজু: শুরুতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল মানুষের আস্থা অর্জন। দরিদ্র মানুষজন, যারা দীর্ঘদিন অবহেলিত, তাদের ভেঙে পড়া বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা কঠিন ছিল। শুরুতে আর্থিক পুঁজির অভাব ছিল। আমরা পিকেএসএফ-এর মতো অংশীদারদের সহায়তায় এবং নিজেদের সঞ্চয় থেকে ছোট ছোট উদ্যোগ নিয়ে কাজ শুরু করি। সামাজিক রক্ষণশীলতা, বিশেষ করে নারীদের বাইরে নিয়ে আসা বা যৌনকর্মীদের সন্তানদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে সামাজিক বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। আমরা কোনও কাজই একা করিনি। সম্প্রদায়ের মানুষদের অংশীদার করে, তাদের সংস্কৃতি ও মূল্যবোধকে সম্মান দেখিয়ে, ধৈর্য ধরে আলোচনা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জগুলো অতিক্রম করেছি। নিয়মিত স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা আমাদের অন্যতম সাফল্যের চাবিকাঠি।

পিকেএসএফ: দরিদ্র মানুষের জন্য উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়নে আপনারা কি বিশেষ দর্শন বা দৃষ্টিভঙ্গিকে ফোকাস করেন? সেটা কি?

মো. আজাদুল কবির আরজু: আমাদের দর্শন সহজ কিন্তু গভীর: “মানুষের ভেতরের শক্তিকে জাগিয়ে তোলা।” আমরা বিশ্বাস করি না যে, দরিদ্র মানুষ দুর্বল বা অসহায়। বরং তাদের মধ্যে সুপ্ত অসাধারণ ক্ষমতা থাকে। আমাদের কাজ হলো সেই শক্তিকে চিনতে ও বিকশিত করতে সাহায্য করা, তাদের হাতে আলো ধরিয়ে দেওয়া, শুধু পথ দেখানো নয়। আমরা দান করতে চাই না, আমরা ক্ষমতায়ন করতে চাই। বিশেষ করে নারী, শিশু, ছিটমহল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে তারা তাদের মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে পারে, সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আমাদের কবি পাওলো ফ্রেইরের ‘সচেতনতা সৃষ্টির শিক্ষা’ (Conscientization) ধারণা এই দর্শনের ভিত্তি। প্রতিটি মানুষের মধ্যেই পরিবর্তনের ইচ্ছা ও সামর্থ্য আছে, শুধু সেটা জাগ্রত করা দরকার।

 

পিকেএসএফ: মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রম বাস্তবায়নে আপনারা পিকেএসএফ-এর নিকট থেকে কি ধরনের সহযোগিতা পেয়ে থাকেন?

মো. আজাদুল কবির আরজু: পিকেএসএফ আমাদের দীর্ঘদিনের নির্ভরযোগ্য অংশীদার। প্রাথমিক পর্যায়ে তহবিল সংকটের সময় পিকেএসএফ থেকে পাওয়া আর্থিক সহায়তা আমাদের ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি শুরুর ভিত্তি তৈরি করে। শুধু নিয়মিত ঋণ তহবিলই নয়, বিভিন্ন বিশেষ প্রকল্প (যেমন: জলবায়ু সহিষ্ণুতা, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, কৃষি বিপণন) বাস্তবায়নের জন্য পিকেএসএফ অনুদান ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করে। এছাড়া, আমাদের কর্মীদের নিয়মিত দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, নীতিমালা প্রণয়নে পরামর্শ, এবং সংস্থার সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা ও টেকসই উন্নয়নে গাইডলাইন দিয়ে থাকেন। তাদের পর্যবেক্ষণ ও তত্ত্বাবধান আমাদের কাজের গুণমান ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।

পিকেএসএফ: আর্থিক সহযোগিতা ছাড়া পিকেএসএফ কি আর কোনোভাবে আপনাদের সংস্থার জন্য ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন?

মো. আজাদুল কবির আরজু: অবশ্যই। পিকেএসএফ একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে ক্ষুদ্রঋণ ও উন্নয়ন খাতের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য মানদণ্ড ও নৈতিক কম্পাস তৈরি করেছে। তাদের সাথে কাজ করার মাধ্যমে আমরা শিখেছি কিভাবে কার্যকর ও স্বচ্ছভাবে বড় আকারের কর্মসূচি পরিচালনা করতে হয়। পিকেএসএফ-এর নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আমরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ভালো চর্চা ও উদ্ভাবনী ধারণার সাথে পরিচিত হই। তাদের মাধ্যমে সরকারের বিভিন্ন নীতি ও কৌশলের সাথে আমাদের কাজের সমন্বয় ঘটানো সহজ হয়। এক কথায়, পিকেএসএফ শুধু তহবিলদাতা নয়, একটি সক্ষমতা বৃদ্ধিকারক ও সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

পিকেএসএফ: জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশন থেকে আপনারা বর্তমানে কি কি কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছেন?

মো. আজাদুল কবির আরজু: মানুষের সমস্যা বহুমুখী, তাই আমাদের কার্যক্রমও ব্যাপক ও বহুমাত্রিক। আমাদের প্রধান ক্ষেত্রগুলো হল:

সহনশীল জীবিকা ও কৃষি: জলবায়ু সহিষ্ণু কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও বিপণন, সৌর সেচসহ আধুনিক কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রচার, মাটির স্বাস্থ্য সংরক্ষণ।

শিক্ষা: প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক (আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক), মাধ্যমিক শিক্ষা সহায়তা। স্কুল থেকে ঝরে পড়া শিশুদের জন্য শিক্ষাকেন্দ্র, মেধাবী দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষা বৃত্তি (প্রফেসর শরীফ হোসাইন বৃত্তি তহবিল)। তরুণদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ।

ক্ষুদ্রঋণ: দরিদ্র ও অতিদরিদ্র নারীদের পুঁজি সংকট দূর করে স্বাবলম্বী করে তোলা। কৃষি, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, ক্ষুদ্র ব্যবসা ইত্যাদি খাতে ৪% থেকে ২৪% হারে ১,০০০ টাকা থেকে ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়া হয়।

স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও ওয়াশ: দরিদ্র মহিলা সদস্যদের বিনামূল্যে শল্যচিকিৎসা সহায়তা (গাইনি সমস্যা, চোখের ছানি), সম্প্রদায়ভিত্তিক পুষ্টি সচেতনতা, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা সম্প্রসারণ (বিশেষ ঋণ সহায়তা)।

মানবাধিকার ও সুরক্ষা: শিশু সুরক্ষা, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সহায়তা, যৌনকর্মীদের সন্তানদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র পরিচালনা ও পুনর্বাসন, রোহিঙ্গা ও আশ্রয় সম্প্রদায়ের শিশু-কিশোরদের শিক্ষা ও সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ।

জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা: জলবায়ু সহিষ্ণু আবাসন, জীবিকা, দুর্যোগ পূর্বাভাস ও প্রস্তুতি, দুর্যোগকালীন ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম।

সামাজিক ব্যবসা: তেল ও মসলা কল, হস্তশিল্প, সুপার শপ পরিচালনার মাধ্যমে নিজস্ব তহবিল গঠন।

পিকেএসএফ: আপনাদের উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের প্রভাবে সাধারণ মানুষের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক জীবনে কি ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে?

মো. আজাদুল কবির আরজু: আমাদের কর্মএলাকায় দীর্ঘ পাঁচ দশকের কাজের প্রভাব আজ সুস্পষ্ট। একসময় যাদের ‘অস্পৃশ্য’ বলে গণ্য করা হত, আজ তারা সম্মানের সাথে সমাজের মূলস্রোতের অংশ। প্রায় ১০ লাখ সুবিধাবঞ্চিত শিশু, শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে উত্তীর্ণ হয়েছে। ৪৩ হাজারের বেশি অতিদরিদ্র নারী আজ স্বাবলম্বী এবং নিজস্ব সংগঠনের মাধ্যমে তারা আজ তাদের পরিবারসহ বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডেও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত থাকে। অনেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন। ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচির মাধ্যমে ৫৯ লাখেরও বেশি মানুষ কৃষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় যুক্ত হয়ে আয় সৃষ্টি করেছেন। পতিতালয়ে জন্ম নেওয়া শিশুদের পুনর্বাসন করে সমাজের মূলধারায় নিয়ে আসা হয়েছে। কেবল আর্থিক সচ্ছলতাই নয়, মানুষের আত্মবিশ্বাস, সামাজিক মর্যাদা এবং নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সার্বিকভাবে জীবনমানের গুণগত পরিবর্তন এসেছে।

পিকেএসএফ: ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমে সুদের হার বেশী, এনজিও গুলো মানুষকে শোষন করে, এ ধরণের কিছু অভিযোগ আছে। এ বিষয়ে আপনার মতামত কি?

মো. আজাদুল কবির আরজু: এই অভিযোগ প্রায়শই অর্ধসত্য বা অজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। আমরা গ্রাহকের ঝুঁকি ও চাহিদার ভিত্তিতে ৪% থেকে সর্বোচ্চ ২৪% সুদ হার নির্ধারণ করি, যা ব্যাংকিং খাতের অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ খাতের তুলনায় যুক্তিসঙ্গত। আমাদের ব্যয় কাঠামো আলাদা: আমরা জামানতবিহীন ঋণ প্রদান করি, আমাদের কর্মীরা দূরদূরান্তের গ্রামে গিয়ে সেবা পৌঁছে দেয়, ঋণের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে ঋণ গ্রহীতার প্রকল্প পর্যায়ে নিয়মিত তত্ত্বাবধান করে। এই সকল অপারেশনাল খরচ (বেতন, যাতায়াত, প্রশিক্ষণ) আমাদের সুদ হারের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকে। আমাদের লক্ষ্য মুনাফা করা নয়, বরং দরিদ্র মানুষের কাছে সেবা পৌঁছে দিয়ে সাশ্রয়ী খরচে কার্যক্রমটি টিকিয়ে রাখা। আমরা মনে করি, ক্ষুদ্রঋণ শোষণের হাতিয়ার নয়, বরং দরিদ্র মানুষকে সুদৃঢ় ভিত্তিতে দাঁড়াতে সাহায্য করার একটি সরঞ্জাম, যদি তা নৈতিক ও স্বচ্ছভাবে বাস্তবায়ন করা হয়।

পিকেএসএফ: আপনাদের প্রতিষ্ঠানের আগামী পাঁচ বছরের জন্য কি বিশেষ কোনো পরিকল্পনা আছে?

মো. আজাদুল কবির আরজু: আমরা সর্বদা ভবিষ্যতমুখী চিন্তা করি। আগামী পাঁচ বছরের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা হল:

সম্পূর্ণ ডিজিটাল রূপান্তর: সকল কার্যক্রম ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা, যাতে সুবিধাভোগীরা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ঋণ লেনদেন, সঞ্চয় জমা ও উত্তোলন এবং কারিগরি পরামর্শ পেতে পারেন।

জলবায়ু সহিষ্ণুতা জোরদার করা: সৌরশক্তি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি চর্চাকে আরও ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করা। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা সহিষ্ণু ফসল ও প্রযুক্তি প্রবর্তনে বিশেষ কর্মসূচি।

শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন: সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য বিদ্যমান শেল্টার হোম ও শিক্ষাকেন্দ্রগুলোকে আধুনিক বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে রূপান্তর করা, যাতে প্রতিটি শিক্ষার্থী কর্মসংস্থানমুখী দক্ষতা নিয়ে বের হতে পারে।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা (এসএমই) তৈরি: কেবল টিকে থাকার জন্য ঋণ নয়, বরং ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতাদের দক্ষ উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলে তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণে পুঁজি ও বাজারজাতকরণে সহায়তা করা।

সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করা: ভ্রাম্যমাণ ক্লিনিক ও টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া, বিশেষ করে বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনী তৈরি করা।

ভৌগোলিক সম্প্রসারণ: দেশের সকল জেলায় কার্যক্রম সম্প্রসারণের মাধ্যমে আরও বেশি সংখ্যক দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছানো।

আমাদের লক্ষ্য সংখ্যাগত বৃদ্ধির পাশাপাশি গুণগত মান নিশ্চিত করে এমন একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে প্রতিটি পরিবার স্থায়ীভাবে দারিদ্র্যের চক্র থেকে মুক্তি পাবে।

পিকেএসএফ: একজন সমাজকর্মী হিসেবে আপনার সবচেয়ে প্রিয় অভিজ্ঞতা কোনটি?

মো. আজাদুল কবির আরজু: প্রতিটি মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখাই আমার সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি। তবে বিশেষভাবে মনে পড়ে, যখন অস্পৃশ্য বলে চিহ্নিত মেথর সম্প্রদায়ের কোনো ব্যক্তি প্রথমবারের মতো নিজের নাম স্বাক্ষর করতে শিখল, সগর্বে মাথা উঁচু করে কথা বলল; অথবা যখন পতিতালয়ে জন্ম নেওয়া কোনো শিশু স্কুলে প্রথম দিনের মতো ব্যাগ নিয়ে হাসতে হাসতে গেল; অথবা যখন একজন দরিদ্র নারী, যিনি বছরের পর বছর গোপন গাইনোকলজিক্যাল সমস্যা বা জরায়ুর টিউমার নিয়ে লজ্জা ও অর্থাভাবে কষ্ট পেয়েছেন, তিনি আমাদের বিনামূল্যে শল্যচিকিৎসা সহায়তা পেয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে আসেন এবং বলতে পারেন, ‘আমি এখন আবার কাজ করতে পারব, আমার সন্তানদের দেখাশোনা করতে পারব’ -এই মুহূর্তগুলো আমাকে একজন সার্থক মুক্তিযোদ্ধা ও সমাজকর্মী হিসেবে গভীর শান্তি দেয়। এগুলোই প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ যখন একজন মানুষ শারীরিক ও সামাজিক বন্ধন থেকে মুক্তি পায়, তার মৌলিক মর্যাদা ফিরে পায়। তাছাড়া, পেশাদার সমাজকর্মী হিসেবে গত পাঁচ দশকে মাদার তেরেসা গোল্ড মেডেল (২০০৯), মাদার তেরেসা আন্তর্জাতিক পুরস্কার (২০১৬, ভারত), বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আন্তর্জাতিক শান্তি পুরস্কার (২০২৩), নেলসন ম্যান্ডেলা স্মারক পুরস্কার (২০১৯)-এর মতো আন্তর্জাতিক সম্মাননা, এবং গুণীজন সম্মাননা পদক, শের-এ-বাংলা স্মৃতি সম্মাননা পদক, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা সম্মাননা, শ্রেষ্ঠ সন্তান পদক, দাদাসাহেব ফালকে ফিল্ম ফাউন্ডেশন পুরস্কার (২০১৯, ভারত)-এর মতো জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্তি আমাদের এই বার্তাই দেয় যে, নিরলস কর্মপ্রচেষ্টা ও নিঃস্বার্থ সেবা কখনো বিফলে যায় না।

এই পুরস্কারগুলো শুধু আমার বা আমাদের প্রতিষ্ঠানের নামের পাশে একটি খেতাব নয়। এগুলো সম্মানিত করে আমাদের সমস্ত দরিদ্র, প্রান্তিক ও সংগ্রামরত মানুষকে যাদের সাথে আমরা কাজ করি। এটি প্রমাণ করে যে, যশোরের একটি ছোট গ্রাম থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রা আজ বিশ্বের দরবারেও মূল্য পেয়েছে। প্রতিটি পুরস্কার আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আমাদের দায়িত্ব এখন আরও বেড়েছে। এটি তরুণ প্রজন্মের জন্য একটি বার্তা যে, সমাজ পরিবর্তনের কাজে আত্মনিয়োগ করলে তার স্বীকৃতি একদিন না একদিন আসবেই। তবে, আমার কাছে সবচেয়ে বড় পুরস্কার হল, যখন একজন অবহেলিত মানুষ তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়, তার শিশুটি স্কুলে যায়, কিংবা একজন নারী স্বাস্থ্যসেবা পেয়ে নতুন জীবন ফিরে পায়। সেই অদৃশ্য ‘মানুষের মুখের হাসির পুরস্কার-ই সবচেয়ে মূল্যবান।

 

পিকেএসএফ: ১৯৭১ সালে আপনার বয়স ১৮ বছর; যে বয়স নিয়ে কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের বিখ্যাত কবিতা আছে, ‘আঠারো বছর বয়সে’। তখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে আপনি যুদ্ধে যোগদান করলেন। আপনার মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করার প্রেক্ষাপট কেমন ছিল, যুদ্ধের অভিজ্ঞতা কি ছিল?

মো. আজাদুল কবির আরজু: ১৯৭১ সাল। আমি তখন যশোর এম.এম. কলেজের ছাত্র ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক। মার্চ মাসে যশোর ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হই। পরে নড়াইল থেকে আসা লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমানের দলে যোগ দিয়ে অস্ত্র ও রসদ সরবরাহের কাজ করি। পাকবাহিনী যশোর দখল করলে ভারতে গিয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়ার চেষ্টা করি, কিন্তু নেতারা আমাকে দেশে ফিরে গোপনে সংগঠিত হওয়ার পরামর্শ দেন। দেশে ফিরে আমি ও আমার বন্ধুরা পাকিস্তানপন্থীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলি। ১৯৭১ সালের ১৪ আগস্ট রাজাকারদের হাতে গ্রেপ্তার হই। তাদের হাতে নির্মম নির্যাতনের শিকার হই। পরে আমাকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। ক্যান্টনমেন্টে আরও নির্যাতনের পর আমাকে যশোর জেলে পাঠানো হয়। পাকিস্তানি সামরিক আদালতে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়। ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর যশোর মুক্ত হলে আমি কারাগার থেকে মুক্তি পাই। সেই অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে স্বাধীনতার মূল্য, মানুষের প্রতি মানুষের নিষ্ঠুরতা, এবং একটি স্বাধীন দেশ গড়ার দায়িত্ব কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

পিকেএসএফ: বর্তমান সময়ে সমাজিক উন্নয়ন কর্মকান্ডে তরুণদের ভূমিকা কিভাবে দেখতে পান? ৫০ বছর পূর্বের তরুনদের সাথে তুলনা করতে বললে, কি বলবেন?

মো. আজাদুল কবির আরজু: আগের প্রজন্মের তরুণরা দেশ গড়ার তাগিদে, আদর্শ ও স্বপ্ন নিয়ে অনুপ্রাণিত ছিল, অনেক সময় সীমিত সম্পদ ও প্রযুক্তি নিয়েই তাঁরা স্বপ্ন ছুঁয়েছে। তাদের ছিল অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও স্বদেশপ্রেম। বর্তমান প্রজন্মের তরুণরা প্রযুক্তি, তথ্য ও বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে অনেক এগিয়ে। তারা দ্রুত শেখে, নতুন ধারণা গ্রহণ করে এবং উদ্ভাবনী পথ বের করতে পারে। তবে কখনো কখনো আদর্শিক Commitment বা দীর্ঘমেয়াদি সংগ্রামের ধৈর্যের অভাব দেখা যায়। সফলতা পেতে হলে উভয় প্রজন্মের গুণাবলির সমন্বয় দরকার: আগের প্রজন্মের ত্যাগ, ধৈর্য ও মূল্যবোধ এবং বর্তমান প্রজন্মের প্রযুক্তিগত দক্ষতা, উদ্ভাবনী চিন্তা ও বৈশ্বিক সংযোগ। আমি মনে করি, আজকের তরুণরাই টেকসই উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হতে পারে, যদি তাদের সঠিক দিকনির্দেশনা ও সুযোগ দেওয়া হয়।

পিকেএসএফ: ১৯৮২ সালে, দেশে সামরিক শাসন জারী হলে আপনাকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে কিছু বিরূপ পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়, যদিও শেষ পর্যন্ত সকল অভিযোগ থেকে আপনি বেকসুর খালাস লাভ করেন। সে ঘটনা কি আপনার পরবর্তী জীবনের কার্যক্রমে কিরকম প্রভাব রেখেছে?

মো. আজাদুল কবির আরজু: ১৯৮২ সালের সেই ঘটনা আমার জীবনের একটি টার্নিং পয়েন্ট। মিথ্যা অভিযোগ ও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে, সত্য ও ন্যায়ের পথে চললে, ভয় নয়, বরং দৃঢ়তা দরকার। এই অভিজ্ঞতা আমাকে আইনের শাসন, বিচারপ্রক্রিয়া ও মানবাধিকার বিষয়ে আরও সংবেদনশীল করে তোলে। এটি জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশনের কার্যক্রমে দরিদ্র মানুষের আইনি সহায়তা ও অধিকার সুরক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে অনুপ্রাণিত করে। এছাড়া, এটি আমাকে শেখায় যে, কোনও সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে টেকসই করতে হলে স্বচ্ছতা, নীতি ও নিয়মানুবর্তিতার বিকল্প নেই। সেই সংকট আমার ধৈর্য ও অধ্যবসায়কে শাণিত করেছিল এবং আমাকে আরও দৃঢ়ভাবে সমাজসেবায় আত্মনিয়োগ করতে প্রেরণা জুগিয়েছিল।

পিকেএসএফ: আপনিতো জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশন ছাড়াও অন্যান্য আরো কিছু প্রতিষ্ঠান সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কোন প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে কিছু বলুন।

মো. আজাদুল কবির আরজু: জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার পর থেকে সুবিধাবঞ্চিত অসহায় জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার মাধ্যমে সমৃদ্ধ সমাজ গড়ার লক্ষ্যে আত্মনির্ভর প্রতিষ্ঠান বিনির্মাণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। এ প্রেক্ষিতে ১৯৮০ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত যশোর শহরে সুইপার কলোনীর উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ঐ কার্যক্রমের সফলতাস্বরূপ ১৯৮৩ সালে ‘মাঠপাড়া উন্নয়ন সমিতি’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সুইপার কমিউনিটিতে জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশন সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য আত্মনির্ভর প্রতিষ্ঠান বিনির্মাণে কাজ শুরু করে।

পরবর্তীতে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত সংস্থা যশোর শহরের বিভিন্ন বস্তিতে মোট ৫৪টি সংগঠন গড়ে তুলে তাদের আত্ম-নির্ভর করার কাজ হাতে নেয় এবং ২০০২ সালে যশোর শহরের ২৫ হাজার বস্তিবাসী নারী তাদের নিজেদের সংগঠনের দায়িত্ব নিজেরা বুঝে নিয়ে গড়ে তোলে ‘জয়তী সোসাইটি’। শুধুমাত্র বিদেশী অনুদানের ওপর নির্ভর না করে সর্ম্পূণ নারী নেতৃত্বের মাধ্যমে র্কাযক্রম পরচিালনার লক্ষ্য নিয়ে যার পথচলা শুরু। বর্তমানে যা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সবচেয়ে বড় ও সক্রিয় নারী উন্নয়ন সংগঠন। একই বছরে (২০০২ সাল) চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা ও জীবননগরের হতদরিদ্র পরিবারের নারী নিজেদের সংগঠন তৈরির কাজ শুরু হয় যা পূর্ণতা পায় ২০০৯ সালে ‘আমরা জয়ী সোসাইটি’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। এছাড়া ২০০৬ সালে রংপুরে শুরু হওয়া এরকম আরো ১৫টি সংগঠন এটার সাথে পরবর্তীতে যোগ হয়। বর্তমানে ১০ হাজারের অধিক নারী আমরা জয়ী সোসাইটির সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত। ২০১৫ সাল হতে নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলায় ৯০০ জন নারী এক হয়ে পরিচালনা করছেন ‘আমারা স্বাধীন সমবায় সমিতি’। এছাড়াও ২০২৩ সাল থেকে যশোর সদর উপজেলার ৫টি ইউনিয়নে সাতটি আত্মনির্ভর সমবায় সমিতি গড়ে তোলা হয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের ১১টি আত্মনির্ভর প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৫১,৮৪২ জনের বেশি হতদরিদ্র নারী তাদের ভাগ্য উন্নয়নের সুযোগ পাচ্ছে। এছাড়াও শিশু নিলয় ফাউন্ডশন, যশোর নৈশবিদ্যালয়, নাজির শংকরপুর শিশুস্বর্গ প্রাথমিক বিদ্যালয়, চারুপীঠ, যৌনকর্মীর সন্তানদের জন্য শেল্টার হোম ইত্যাদি সংস্থা প্রতিষ্ঠায় আমি সম্পৃক্ত থেকে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছি।  

পিকেএসএফ: আপনি স্কুল জীবন থেকেই আবৃত্তি, অভিনয়, কবিতা লেখা ইত্যাদি কার্যক্রমের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছেন। ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য এসব সৃজনশীল কর্মকান্ড কতোটা গুরুত্বপূর্ণ বলে আপনি মনে করেন?

মো. আজাদুল কবির আরজু: অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল চর্চা মানুষকে সংবেদনশীল, সহানুভূতিশীল ও গভীর চিন্তাশীল করে তোলে। আবৃত্তি বা অভিনয় অন্য মানুষের অনুভূতি ও অবস্থানকে বুঝতে শেখায়। কবিতা লেখা বা গান গাওয়া অন্তরের কথাকে প্রকাশ করার, কল্পনাশক্তি বাড়ানোর মাধ্যম। একটি উন্নত মন ও সুকুমারবৃত্তি ছাড়া প্রকৃত ‘মানুষ’ হওয়া যায় না। আজকের তরুণরা প্রযুক্তিতে পারদর্শী, পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক চেতনায় সমৃদ্ধ হলে তারা আরও পরিপূর্ণ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হয়ে উঠতে পারবে বলে আমি বিশ্বাস করি।

পিকেএসএফ: আপনার জীবনের এমন কোন ঘটনা কি মনে পড়ে, যা আপনার চিন্তার জগতকে প্রভাবিত করেছিল? যা আজকের আরজু হয়ে ওঠার পথে আপনাকে অনুপ্রাণিত করেছে?

মো. আজাদুল কবির আরজু: কয়েকটি ঘটনা আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। শৈশবে মানসিক প্রতিবন্ধী একজন নারীর প্রতি শিশুদের নিষ্ঠুরতা দেখে: তখনই অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দায়বদ্ধতা জন্ম নেয়। স্বাধীনতার পরও ‘অস্পৃশ্য’ মেথর সম্প্রদায়ের প্রতি বৈষম্য: একটি চায়ের দোকানে তাদের আলাদা পাত্রে চা দেওয়ার দৃশ্য দেখে আমি ক্রোধে ও লজ্জায় জ্বলে উঠেছিলাম। ভেবেছিলাম, এই কি আমাদের স্বাধীনতা? ১৯৮১ সালে যশোরের পতিতালয় পরিদর্শন: সেখানে এক যৌনকর্মীর কোলের নবজাতক শিশুকে দেখে প্রশ্ন করেছিলাম, “এই শিশুর বাবা কে?” মা শিশুকে চুমু খেয়ে হেসে উত্তর দিলেন, “এই ত্রুটিগুলোও আমাকে মাতৃত্বের স্বর্গীয় আনন্দ থেকে বঞ্চিত করতে পারেনি।” সমাজ যাদের ঘৃণা করে, তাদেরও যে মাতৃত্বের স্বপ্ন ও মর্যাদা আছে, -এই উপলব্ধি আমাকে যৌনকর্মী ও তাদের সন্তানদের জন্য কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে।

এই ঘটনাগুলোই আমাকে বুঝতে শিখিয়েছে যে, প্রকৃত উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক মুক্তি নয়, সামাজিক মর্যাদা, শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধের মুক্তি।

পিকেএসএফ: এমনকি কোন কিছু কি আছে যা আপনি চেয়েছিলেন; কিন্তু এখনো করতে পারেননি। অথবা যেভাবে চেয়েছিলেন ঠিক সেভাবে হয়নি।

মো. আজাদুল কবির আরজু: মানুষের চাওয়ার কোনো শেষ নেই। অনেক অর্জনের পাশাপাশি কিছু স্বপ্ন অপূর্ণ রয়ে গেছে। একটি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা: জনসেবার এই বৃহত্তর স্বপ্নটি এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। সমাজ থেকে অস্পৃশ্যতা ও বৈষম্যের শতভাগ নির্মূল: আমরা অনেক দূর এগিয়েছি, কিন্তু এখনো মনোজগতে কিছু দূরত্ব ও বৈষম্য রয়ে গেছে। দারিদ্র্য বিমোচনের গতি: দারিদ্র্য কমেছে, কিন্তু আমার কাঙ্ক্ষিত গতিতে ও গভীরতায় নয়। মানবিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের পুনরুজ্জীবন: বস্তুগত উন্নয়নের পাশাপাশি মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা, সহিষ্ণুতা ও সাংস্কৃতিক চেতনার যে উৎকর্ষ আমি চেয়েছিলাম, বর্তমান সমাজের ভোগবাদ ও অসহিষ্ণুতা দেখে মনে হয় সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে আরও অনেক পথ হাঁটতে হবে।

পিকেএসএফ: আমরা শুনেছি আপনি মৃত্যু পরবর্তী আপনার দেহ দান করেছেন, ঠিক কি বিবেচনায় আপনি এরকম সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনুপ্রাণিত হয়েছেন?

মো. আজাদুল কবির আরজু: সারা জীবন মানুষের সেবায় কাটালাম। এই নশ্বর দেহ মৃত্যুর পর মাটিতে পচে যাওয়ার চেয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের গবেষণা ও জ্ঞানার্জনে কাজে লাগুক, এই নিঃস্বার্থ চিন্তা থেকেই মরণোত্তর দেহদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এটিই হতে পারে জীবনের শেষ শিক্ষা ও দান।

পিকেএসএফ: আপনাদের প্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের জন্য আপনার কি পরামর্শ আছে?

মো. আজাদুল কবির আরজু: যারা এই পথে হাঁটতে চান, তাদের জন্য কয়েকটি সহজ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ:

এটি কেবল চাকরি নয়, একটি ব্রত: উন্নয়ন কাজ মানে একজন মানুষের ভাগ্যের সাথে জড়িত থাকা। এখানে নিষ্ঠা, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতা প্রধান চালিকাশক্তি হওয়া উচিত।

সততা ও স্বচ্ছতা: মানুষের আমানত (তহবিল ও আস্থা) নিয়ে কাজ করছেন। প্রতিটি টাকার সদ্ব্যবহার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করুন। সততাই আপনার আসল পরিচয়।

সম্মান ও বন্ধুত্ব: দরিদ্র মানুষ করুণার পাত্র নন, তারা সমান মর্যাদার অধিকারী। তাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করুন, তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন। তাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে মূল্য দিন।

ধৈর্য ও স্থায়িত্ব: সামাজিক পরিবর্তন ধীর গতির কিন্তু স্থায়ী। প্রতিকূলতা আসবেই, ধৈর্য ধরে গঠনমূলক কাজ চালিয়ে যান।

নিজেকে আপডেট রাখুন: নতুন প্রযুক্তি, উন্নয়ন কৌশল ও বৈশ্বিক চর্চা সম্পর্কে জানুন। গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে উদ্ভাবনী চিন্তা করুন।

মাঠের ধুলো মাখুন: অফিসের রিপোর্টের চেয়ে মাঠের বাস্তবতা জানা গুরুত্বপূর্ণ। সরাসরি মানুষের সংস্পর্শে থাকুন।

সহযোগিতা ও নেটওয়ার্ক: একা সবকিছু করা যায় না। সরকার, অন্যান্য সংস্থা ও স্থানীয় নেতাদের সাথে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তুলুন।

মনে রাখবেন, আপনার ছোট্ট একটি নিষ্ঠাপূর্ণ কাজ একটি পরিবারের অন্ধকার দূর করতে পারে। আমরা হয়তো সব সমস্যার সমাধান করতে পারব না, কিন্তু একজন মানুষের মুখেও যদি হাসি ফোটাতে পারি, সেটাই আমাদের শ্রমের সার্থকতা।

পিকেএসএফ: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আপনার সুস্বাস্থ্য কামনা করছি।

মো. আজাদুল কবির আরজু: ধন্যবাদ পিকেএসএফ ও পিকেএসএফ পরিক্রমা কে এই সুযোগ দেওয়ার জন্য। সকলের সুস্থতা ও সমৃদ্ধি কামনা করি।