পিকেএসএফ পরিক্রমা-এর জানুয়ারি-মার্চ ২০২৬ সংখ্যার জন্য

জনাব মোঃ আবু জাফর, নির্বাহী পরিচালক, দারিদ্র বিমোচন সংস্থা (ডিবিএস)-এর সাক্ষাৎকার

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা মেহেরপুরের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘দারিদ্র বিমোচন সংস্থা (ডিবিএস)’। এই মহতী উদ্যোগের নেপথ্য কারিগর এবং স্বপ্নদ্রষ্টা হলেন জনাব মো. আবু জাফর। প্রতিষ্ঠানটির সূচনালগ্ন থেকে বিগত প্রায় ৩৪ বছর ধরে তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠা ও বিচক্ষণতার সাথে নির্বাহী পরিচালক হিসেবে এর সফল নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন।

তৃণমূল পর্যায়ে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে ১৯৯৭ সালে পিকেএসএফ-এর সহযোগী সংস্থা হিসেবে তালিকাভুক্ত হয় ডিবিএস। বর্তমানে সংস্থাটি মেহেরপুরসহ পার্শ্ববর্তী ৪টি জেলার ৩৮টি শাখার মাধ্যমে বহুমুখী উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। জনাব জাফরের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে আজ প্রায় ৩.৫ লক্ষ পরিবার ডিবিএস-এর বিভিন্ন প্রকল্পের প্রত্যক্ষ সুফল ভোগ করছে। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রান্তিক মানুষের ভাগ্যবদল ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে নিরলস কাজ করে চলা এই নিভৃতচারী সংগঠকের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, সংস্থার অর্জন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে এই বিশেষ সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন মোহাম্মদ মিনহাজ উদ্দিন শেখ, সহকারী মহাব্যবস্থাপক, পিকেএসএফ।

পিকেএসএফ: আপনার শৈশব ও শিক্ষা জীবনের স্মৃতি দিয়ে শুরু করতে চাই; বিশেষ করে একজন চিকিৎসক হওয়ার পেছনে আপনার মূল প্রেরণা কী ছিল?

জনাব মো. আবু জাফর: আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা মেহেরপুরের অদূরে কুতুবপুর ইউনিয়নের সুবিদপুর গ্রামে। মাধ্যমিক, উচ্চ-মাধ্যমিক মেহেরপুরেই সম্পন্ন করি। ১৯৭০ সালে আমি ডেন্টাল এন্ড ওরাল মেডিসিনের ওপরে ডিপ্লোমা কোর্স সম্পন্ন করি। ১৯৭০ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত সুদীর্ঘ ২৭ বছরের চিকিৎসক জীবনের যাত্রা শুরু এখান থেকেই। শৈশব থেকেই গ্রামীণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যগত দৈনতা একেবারে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। চিকিৎসার অপ্রতুলতায় আমার ছোট বোনের মৃত্যু, ভুল চিকিৎসায় আমার খুব কাছের একজন মানুষের ক্যান্সারে মৃত্যু- সব মিলিয়ে কোন পরিপ্রেক্ষিতকে মূল অনুপ্রেরণা হিসেবে নির্দিষ্ট করা কষ্টকর। সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত দৃষ্টিভঙ্গী, নিজস্ব তাগিদ আর পারিপার্শ্বিকতা- সবকিছুই আমার চিকিৎসক হওয়ার পেছনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। এর যেকোন একটা যদি না থাকতো তাহলে হয়ত শারীরীক চিকিৎসার থেকেও দীর্ঘমেয়াদী দারিদ্র দূরীকরণের জন্য যে মানুষের আরো কিছু প্রয়োজন – তা দেখার সুযোগ হত না। যেটা পরবর্তীতে পিকেএসএফ মাধ্যমে আমি দেখেছি। ১৯৯৭ সালের পর থেকে চিকিৎসক জীবন অনিয়মিত হলেও চিকিৎসা বিজ্ঞান নিয়ে কৌতুহল আর আর্ত-মানবতায় সেবামূলক দৃষ্টিভঙ্গী আমার পিছু ছাড়েনি।     

পিকেএসএফ: চিকিৎসা পেশার মতো একটি সম্মানজনক পেশা থেকে পূর্ণকালীন সমাজ উন্নয়ন বা এনজিও সেক্টরে আসার সিদ্ধান্তটি কেন নিয়েছিলেন?

জনাব মো. আবু জাফর: চিকিৎসা জীবনের শুরুতেই আমি একটা জিনিস লক্ষ্য করেছিলাম, সেটা হল, মানুষের দারিদ্র্য শুরু হয় মন থেকে। আমার সিংহভাগ রোগীই ছিল দৈনতার একেবারে নিচের তলার বাসিন্দা। তাদের আর্থিক দারিদ্র্যের থেকেও বড় ছিল মানসিক দারিদ্র্য। নিজের বর্তমান অবস্থাকে মেনে নেওয়া, নিজের সামর্থ্যকে ছোট করে দেখা- সব মিলিয়ে তারা গন্ডিবদ্ধ জীবনকেই নিজেদের নিয়তী হিসেবে মেনে নিয়েছিল। আল্লাহপাকই আমার এই অবস্থার জন্য দায়ী, টাকা পয়সা নাই কিভাবে কি করব, ছেলেপেলে লেখাপড়া শিখিয়ে কি হবে দোকানে কাজে লাগিয়ে দেই দুইটা টাকা ইনকাম করতে পারবে- এই হচ্ছে তাদের মন মানসিকতা। যেকোন দূর্দশার জন্য সৃষ্টিকর্তাই দায়ী, এমনকি অসুখবিসুখ হলেও তারা পারতঃ পক্ষে ডাক্তার কিংবা ঔষধপত্র থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করত। তাদের এই মানসিক দৈনতা থেকেই আর্থিক দৈনতার শুরু। প্রথাগত শিক্ষাবিমুখ হওয়ার কারণে তাদের দক্ষতাও বাড়ে না। দক্ষতা না বাড়ার কারণে তাদের আর্থিক সীমাবদ্ধতাও দূর হয় না। সৃষ্টিকর্তা হয়ত তেমন দেখার সামর্থ্য দিয়েছিলেন বলেই আমি দেখেছি, দিনের পর দিন কিভাবে মানুষ নিজের সম্ভাবনাকে নিজের সীমাবদ্ধতা দিয়ে মেরে ফেলছে। মূলত, তাদের মানসিক দারিদ্র্য দূর করাটাই আমাকে এই সামাজিক উন্নয়নমূলক এনজিও সেক্টরে আসতে উদ্বুদ্ধ করেছে।

পিকেএসএফ: আপনার কর্মজীবনের শুরুর দিকের কোনো বিশেষ অভিজ্ঞতা কি আপনার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল?

জনাব মো. আবু জাফর: কর্মজীবনের শুরুটা অনেক কঠিন ছিল। আর পাঁচটা মানুষের মত চাকুরি, নির্দিষ্ট বেতন, তার ওপর ভিত্তি করে পরিকল্পনা-এসব কিছুই হয়ে ওঠেনি। একেবারে শৈশব জীবন থেকেই পরিবারের দায়িত্ব নিতে হয়েছে। ডাক্তারি পেশা কিভাবে কিভাবে উন্নয়নকর্মী হিসেবে আমার দৃষ্টিভঙ্গী বদলে দিতে শুরু করেছে নিজেও বুঝতে পারিনি। সব মিলিয়ে কর্মজীবন আমাকে নানান প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে পরীক্ষা করে তারপর আজকের আসনে বসিয়েছে।

তবে, জীবনের একটা ঘটনা ঘটেছে যেটা একেবারেই আমার পেশাগত জীবনের সাথে একেবারেই সামঞ্জস্যহীন। কিন্তু, আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। আমি তখন মাত্র ডাক্তারি শুরু করেছি। দেশে তখন মুক্তিযুদ্ধ চলছে। আমি সকালবেলা সাইকেল নিয়ে বের হয়েছি রুগি দেখবো বলে। বাড়ি থেকে বের হয়েই হঠাৎ দেখি সাইকেলের টায়ারে বাতাস নেই। বাধ্য হয়ে সাইকেল ঠেলতে ঠেলতে সাইকেল মেরামতের দোকানে গেলাম। গিয়ে দেখি সাইকেলের দোকান বন্ধ। বাধ্য হয়ে ফিরে যাই। ফিরতি পথে কিছুদূর এগোনোর সাথে সাথে সাইকেলের দোকানের সামনে একটা শেল পড়ে। যদি সাইকেলের দোকানটা সেদিন খোলা থাকতো তাহলে হয়ত আজকে আমার এখানে পিকেএসএফকে সাক্ষাতকারটা দেওয়া হত না। এই যে জীবনকে নতুন করে পাওয়া, মৃত্যুকে একেবারে কাছ থেকে দেখা, এইটা জীবনের প্রতি আমার দৃষ্টিভঙ্গীকেই বদলে দিয়েছিল।   

পিকেএসএফ: মেহেরপুরের মতো একটি সীমান্তবর্তী ও পিছিয়ে পড়া জেলায় দারিদ্র বিমোচন সংস্থা (ডিবিএস)প্রতিষ্ঠার পেছনের প্রধান উদ্দেশ্য বা সেই সময়কার তাগিদটি কী ছিল?

জনাব মো. আবু জাফর: মেহেরপুর অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া জেলাগুলোর মধ্যে একটা তা আপনি নিজেও জানেন। কিন্তু, ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের আগে কিন্তু এই অঞ্চলটি এতটা অবহেলিত ছিল না। নদীয়ার মহকুমা থাকাকালীন সময়ে এটি ছিল অত্র এলাকার কৃষিজ অর্থনৈতিক রাজধানী। এত উর্বর তিন-ফসলি জমি এই অঞ্চলের মধ্যে একসাথে পাওয়া দুস্কর। এমনকি দেশ বিভাগের পরও আমরা দেখেছি মেহেরপুরে প্রচুর পরিমাণে আমন ধান, পাট আর তেলবীজ উৎপাদিত হত। যদিও তখনকার সময়ে আধুনিক সেচ ব্যবস্থা, রাসায়নিক সারের সরবরাহ ছিল না। কিন্তু তারপরও মহিষের গাড়ি বোঝাই করে সাপ্তাহিক হাটের দিন কুষ্টিয়া থেকে বড়বড় আড়তদারেরা আসতো পাট, ধান, তেলবীজ কিনতে। কিন্তু এই উর্বরতাই মেহেরপুরের জন্য একইসাথে আশীর্বাদ আবার একই সাথে অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তৎকালীন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিতে মেহেরপুর-কুষ্টিয়া এলাকার মত ব্যাপক মাত্রায় ‘নীল চাষ’ আর কোথাও হয়নি। এই নীল চাষের জন্যই এখানকার মানুষকে নির্যাযিত, নিষ্পেষিত হতে হয়েছে। এই উর্বর কৃষি জমির কারণে এখানকার অর্থনীতিটা কৃষি ভিত্তিক অর্থনীতিতেই আটকে আছে। কারণ, কৃষিজ জমিতে স্বাভাবিকভাবেই কেউ শিল্প-কলকারখানা ওঠা উচিত না। আর, যেহেতু পারিবারিকভাবেই কৃষিকাজ হিসেবে একটা নিরাপদ আয়ের উৎস আছে, তাই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আবেদন, জেলার বাইরে গিয়ে নতুন কিছু করার তাগিদ এখানকার মানুষের কাছে কিছুটা কম। যেখানে মানুষের অর্থনীতি মৌলিক ভিত্তিই হচ্ছে কৃষি। আর যেখানে কৃষি আছে সেখানে শিল্প, বাণিজ্যের সম্ভাবনাও আছে। মেহেরপুরে যেটা সমস্যা, সেটা হল- কৃষির সাথে শিল্প কিংবা বাণিজ্যের প্রত্যক্ষ কোন সংযোগ না থাকা। কেউ সেটা সেভাবে করার চেষ্টাও করেনি। যেই কৃষক ধান ফলাচ্ছে, সে ধানই ফলাচ্ছে। ধান থেকে সর্বোচ্চ চাল করছে। কিন্তু চাল থেকে যে চালের ব্র্যান অয়েল বানানো যায় এটা সে জানে না। জানলেও হয়ত অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, জ্ঞ্যানগত সীমাবদ্ধতা, দক্ষতাগত সীমাবদ্ধতার কারণে আর সামনে এগোতে চাচ্ছে না। কিন্তু কেউ একজন উদ্যোগ নিয়ে যদি এই কৃষিজপণ্যগুলোকেই একটা আলাদা উপযোগমূল্য দেওয়ার চেষ্টা করে- আমার মনে হয় মেহেরপুরে অনেক বড় একটা কৃষিজ-শিল্প গড়ে উঠতে পারে। শুধুমাত্র এই কৃষিজ-শিল্প গড়ে না ওঠার কারণেই আজকে মেহেরপুরে সুষ্ঠু যোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। বিশেষ করে রেলসংযোগ না থাকাটা এই এলাকার জন্য অনেক বড় একটা অপ্রাপ্তি। খুলনা-ঢাকা-চট্টগ্রাম বাণিজ্যিক রুটের অনেকটা বাইরে থাকার কারণে মেহেরপুরে তেমন বড় কোন বিনিয়োগও আসে না। যদি কৃষিভিত্তিক শিল্প যেমন ডেইরি বা দুগ্ধজাত পণ্য উদপাদন, সব্জি প্রক্রিয়াজাতকরণ, পাটজাত দ্রব্য তৈরী ইত্যাদির মত উদ্যোগ হাতে নেওয়া যায় তাহলে আমরা মেহেরপুরের কৃষিকে আরেকটু উন্নত মাত্রায় নিয়ে যেতে পারবো। এর জন্য যে বিরাট দক্ষতা বা বিনিয়োগের প্রয়োজন তাও কিন্তু না। ছোটখাট কুটির শিল্পের মাধ্যমে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ যেমন ঝড়ে পড়ে যাওয়া বা অপুষ্ট বা পাখিতে খাওয়া আমের ভালো অংশটুকু দিয়ে সহজেই কিন্তু বাড়ির দুই একজন সদস্য মিলে আচার তৈরী করে বাজারজাত করতে পারে। আমাদের মেহেরপুরে কৃষিজ সামর্থ্য আছে, বাণিজ্যের সম্ভাবনাও আছে। কিন্তু, এই সামর্থ্য আর সম্ভাবনার মধ্যেকার যে বিরাট শূণ্যতা- এটাই আমার দারিদ্র বিমোচন সংস্থা (ডিবিএস)-কে গড়ে তোলার মূল তাগিদ হিসেবে কাজ করেছে। মানুষের সংখ্যাতাত্ত্বিক উন্নয়নের শুরুটা হলে আস্তে আস্তে শিক্ষা, স্বাস্থ্য-এর মত গুণগত মানোন্নয়নের দিকগুলো খুব সহজেই চলে আসে। যার হাতে টাকা নেই, খাবার নেই, তাকে আমি কিভাবে বলব যে, খাবার আগে ভালো করে হাত ধুয়ে নাও? 

পিকেএসএফ: আপনাদের সংস্থার কর্মসূচিতে স্বাস্থ্যপুষ্টির বিষয়টি আপনি কতটা গুরুত্বের সাথে অন্তর্ভুক্ত করেছেন

জনাব মো. আবু জাফর:  ডিবিএস এর প্রাথমিক কর্মসূচিও ছিল ক্ষুদ্রঋণ। পাশাপাশি সীমিত পরিসরে স্বাস্থ্য সেবা চালু ছিল। মানুষের সম্ভাবনা আর সামর্থ্যের মধ্যেকার শূণ্যস্থান পূরণই ছিল এই ক্ষুদ্রঋণের মূখ্য উদ্দেশ্য। একজন বলদ-লাঙ্গল দিয়ে হালচাষ করে যে পরিমাণ ধান উৎপাদন করছে, সামান্য আর্থিক প্রণোদনা পেলে সে একটা ট্র্যাক্টর বা পাওয়ার টিলার কিনে হয়ত তার থেকে কম সময়ে বেশি ধান উতপাদন করতে পারতো। তার মাথাপিছু উৎপাদনশীলতা বাড়তো। কিন্তু ‘স্বাস্থ্য আর পুষ্টি’র সাথে এই উৎপাদনশীলতা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একজন মানুষের ঋণের অর্থ যদি তার নিজের বা পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসা ব্যায়েই খরচ হয়ে যায়, তাহলে সে উৎপাদনশীলতা কিভাবে বাড়াবে? Loan Diversion এর মত এই ব্যপারগুলো তখন বেশিরভাগ হঠাৎ চিকিৎসা ব্যয়ের কারণেই হত। তাই, স্বাস্থ্যগত দিক দিয়ে সুস্থ আর যথাযথ পুষ্টি পেলে তার ঋণের অর্থ সঠিক প্রকল্পে খরচ হওয়ার সম্ভাবনাটা বাড়ে। এই বিষয়টা লক্ষ্য করেই আমরা পেশাগত দায়িত্ববোধ থেকেই সমিতিপর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া শুরু করি। সমিতির সদস্যদের রক্তচাপ মেপে দেওয়া, তাদের রক্তশূণ্যতা, পানিশূণ্যতা রোধের জন্য চিকিৎসা দেওয়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভের দেওয়া স্যাম্পল মেডিসিনগুলো আমি একেবারে তৃণমূল পর্যায়ের মানুষদেরকে দেওয়া শুরু করি। বিশেষ করে কৃমির ওষুধ, আইরন ট্যাবলেট বিতরণ করতাম। তাছাড়া সমিতি পর্যায়ে মাঠকর্মীদের মাধ্যমে সাধারণ স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক প্রচারণাগুলো করতাম। যেমন, যারা খাওয়ার আগে হাত ভালো করে হাত ধুয়ে খায়, যাদের স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটারি ল্যাট্রিন আছে, তাদেরকে ঋণের জন্য অগ্রাধিকার দেওয়া। সমিতিতে আসার সময় অবশ্যই স্যান্ডেল পরে আসা। এইসব ছোটখাট সুঅভ্যাস গঠন আমাদের সমিতির নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ ছিল। এতে করে কিছুটা হলেও তাদের স্বাস্থ্যগত আর পুষ্টিগত উন্নতি সাধিত হত। কিন্তু, বারবারই একটা প্রাতিষ্ঠানিক দিকনির্দেশনার অভাব বোধ করতাম। কারণ, ব্যক্তিগতভাবে এইধরণের স্বাস্থ্যসেবা দীর্ঘমেয়াদি হত না। আর এই স্বাস্থ্যসেবার পরিধিও হত সংকীর্ণ। এই জন্যই ‘সমৃদ্ধি’র মত সময়োপযোগী একটি কর্মসূচি হাতে নেওয়ার জন্য পিকেএসএফ-কে অসংখ্য ধন্যবাদ। কিন্তু, সমৃদ্ধি কর্মসূচির মাধ্যমেই আমরা প্রথম আমাদের ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের সাথে ‘স্বাস্থ্য ও পুষ্টি’ বিষয়টা সংযুক্ত করি। স্বাস্থ্য পরিদর্শকদের মাধ্যমে খানা বা পরিবার পরিদর্শন। প্রসূতি মা ও কিশোরীদেরকে পুষ্টিকণা দেওয়া। যাতে করে তাদের পুষ্টিহীনতা কিছুটা হলেও হ্রাস পায়। একেবারে গরিব, খেটে খাওয়া মানুষের ছোট খাট চিকিৎসাসেবা তারা বাড়িতে বসেই পেতে পারে শুধুমাত্র ২০ টাকা দিয়ে কেনা স্বাস্থ্যকার্ডের মাধ্যমে। আসন্ন দিনগুলোতে অন্যান্য কর্মসূচির সাথে স্বাস্থ্য ও পুষ্টিকার্যক্রম একটি সম্পূরক ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা যাচ্ছে। সপ্তাহে একদিন প্রতিটি সমিতিতে একজন করে স্বাস্থ্য পরিদর্শক সদস্যদের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা দেবেন। তাদের প্রাথমিক স্বাস্থ্য সমস্যাগুলোর সমাধান করার চেষ্টা করবেন। এবং মাসে একদিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের মাধ্যমে স্যাটেলাইট ক্লিনিকে সকল সদস্যের স্বাস্থ্য পরিসেবা নিশ্চিত করবে। এটা Bee-hive মডেলে বাস্তবায়িত হবে। কয়েকটি সমিতি মিলে একটা জোন তৈরী হবে এবং স্যাটেলাইট ক্লিনিকের মাধ্যমে জোনের সকল সদস্যকে স্বাস্থ্য পরিষেবা দেওয়া হবে। সদস্য কল্যাণ তহবিল থেকেও এই স্বাস্থ্য পরিসেবায় কিছু উন্নতি আনা সম্ভব তবে সেটা দীর্ঘমেয়াদে করতে গেলে অবশ্য MRA আর PKSF-কে নীতিগত দিক দিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। মানুষের সাথে শুধু ঋণ বা অর্থের লেনদেন করেই সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী করা যায় না।

পিকেএসএফ: ডিবিএস-এর এই দীর্ঘ পথচলায় শুরুর দিকের কঠিন দিনগুলোর কোনো স্মৃতি কি আমাদের সাথে শেয়ার করবেন?

জনাব মো. আবু জাফর: ডিবিএস-এর শুরুর দিনগুলো ছিল সত্যিই অনেক কঠিন, তবে সেই সময়গুলোই আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষক। শুরুতে আমাদের প্রয়োজনীয় তহবিলের ঘাটতি ছিল, অফিসের জন্য ছিল একটি ছোট ঘর; যেটা আমরা কোনমতে মেরামত করে ব্যবহারউপযোগী করে তুলেছিলাম। সীমিত কিছু আসবাব। বন্ধুর কাছ থেকে ধার করে আনা বেঞ্চ। অনেক সময় কর্মীরাই তাদের চেয়ার-টেবিল জোগাড় করেছে, আবার অনেক সময় খোলা জায়গায় বসেই মিটিং করেছি।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল মানুষের আস্থা অর্জন করা। যখন আমরা গ্রামে গিয়ে বলতাম -“আমরা আপনাদের সাথে কাজ করতে চাই। আপনাদেরকে ঋণ সহায়তা দিতে চাই।” অনেকেই সন্দেহের চোখে দেখতেন। কেউ কেউ সরাসরি বলতেন -“এই ধরনের অনেকেই আসে, পরে আর খোঁজ থাকে না।” কেউ রাখঢাক না করে সরাসরি ‘বাটপার’ কিংবা ‘ধাপ্পাবাজ’ বলে দিত। যেটা আসলে খুবই স্বাভাবিক ব্যপার ছিল।

একবারের কথা মনে আছে -আমাদের একজন কর্মী, নাম সাইফুল। সারাদিন ঘুরেও কোনো গ্রুপ গঠন করতে পারেনি। সন্ধ্যায় এসে সে খুব হতাশ হয়ে বলেছিল, “মানুষ বিশ্বাস করছে না, স্যার।” তখন আমি তাকে বলেছিলাম, -“বিশ্বাস একদিনে আসে না, আমাদের কাজ দিয়েই সেটা তৈরি করতে হবে।” আমরা হাল ছাড়িনি। নিয়মিত গ্রামে গিয়েছি, মানুষের সাথে বসেছি, কথা বলেছি, তাদের সমস্যা বুঝেছি। ধীরে ধীরে কয়েকজন মানুষ আমাদের ওপর ভরসা করতে শুরু করলেন। সেই ছোট ছোট আস্থার ভিত্তিতেই আজকের এই প্রতিষ্ঠান দাঁড়িয়ে আছে।আরেকটি বিষয় খুব মনে পড়ে, -আমাদের অনেক সময় সীমিত সম্পদের কারণে নিজস্ব ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। কিন্তু তখন একটা জিনিস আমাদের এগিয়ে নিয়েছে,  -সেটা বিশ্বাস, যে আমরা যদি টিকে থাকতে পারি, তাহলে এই কাজ মানুষের জীবনে সত্যিকার পরিবর্তন আনতে পারবে। অনেক পরে জেনেছি, যেই কদিন সাইফুল পাগলের মত হন্যে হয়ে সমিতি গঠন করার জন্য ঘুরে বেড়িয়েছে, সেই কয়দিনের কোন একদিনে তার বাবা বৈদ্যুতিক শকে মারা গেছে। সাইফুল বাড়ি যেতে পারেনি।

শুরুতে মানুষ মনে করত আমরা প্রতারক, হয়ত ঋণ দেওয়ার বিপরীতে আমাদের কোন হীন স্বার্থ আছে। ঋণের অর্থ নিয়ে অনেকে পালিয়ে যেত যেটার প্রভাব সঞ্চয়ী সদস্যদের ওপরেও পড়ত। অনেক সময় মাঠকর্মীরা মাঠপর্যায়ে লাঞ্ছনার শিকার পর্যন্ত হত। সব মিলিয়ে, অন্যান্য সব কিছুর মত ডিবিএস-এর পথ চলাটাও খুব একটা সহজ ছিল না। এখনকার সামাজিক প্রেক্ষাপট যতটা সহনশীল , যতটা স্থিতিস্থাপক- তখনকার সময়ে এটা ছিল না। ধর্মীয় গোঁড়ামি, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাব- সব মিলিয়ে মানুষের আস্থা অর্জন করাটা ছিল অনেক কঠিন। এছাড়াও, যোগাযোগ ব্যবস্থাও এখনকার মত এত উন্নত ছিল না। কোথাও হয় ব্রিজ নেই। কোন এলাকায় হাঁটু পর্যন্ত কাদা। কোন এলাকা হয়ত বন্যায় তলিয়ে গিয়েছে। বর্ষাকাল আসলেই যাতায়াত ব্যবস্থা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠত। মানুষের হাতে কাজ থাকতো না। ঋণ আর সঞ্চয়ের ভারসাম্য বজায় রাখতে গিয়ে হিমশিম খেতে হত রীতিমত। এতকিছু পার করে যখন মাঠকর্মীরা বেতনের জন্য আমার সামনে এসে দাঁড়াত আমি তাদের দিকে তাকাতে পারতাম না। নিজের চিকিৎসা পেশা থেকে আয় করা টাকা থেকে তাদেরকে বেতন দিতাম। তাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। তাদের অমানসিক পরিশ্রমের কাছে সেই কঠিনদিনগুলো হার মানতে বাধ্য হয়েছে। মেহেরপুরের এমনও অনেক এলাকা আছে যেখানে আমাদের সমিতির বয়স সংস্থার বয়সের সমান। সেইসব সমিতিতে আজো সদস্যরা আসেন। বসেন। সেইসব সমিতিগুলো এখনও আমাদের সম্পর্কের প্রথম দিককার কঠিনদিনগুলোকে মনে করিয়ে দেয়।

পিকেএসএফ: শুরুর দিকে যখন কোনো বড় দাতা সংস্থা বা পিকেএসএফ-এর মতো প্রতিষ্ঠানের সমর্থন ছিল না, তখন তৃণমূল পর্যায়ে কার্যক্রম ও জনবল কীভাবে গুছিয়েছিলেন?

জনাব মো. আবু জাফর: মানুষের আস্থা অর্জন করাটা অনেক কঠিন ছিল। একদিনে বা এক সপ্তাহের মধ্যে হঠাৎ করে মানুষের আস্থা অর্জন করা সম্ভব হয়নি। এলাকার শিক্ষক কিংবা প্রভাবশালী অনেকেই ছিলেন যারা আমাদের শুভ চিন্তাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। নির্দিষ্ট করে কারো নাম বলব না কিন্তু মুজিবনগর, কুতুবপুর, গাংনীর বেশ কয়েকজন শিক্ষক রয়েছেন যারা আমাদের হয়ে সদস্যদেরকে বুঝিয়েছেন। বুঝিয়েছেন ঋণের অর্থ কোন বোঝা না। বরং যদি সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায় তাহলে তা একটা সুযোগ। তারা আমাদের বিশ্বাসের জামিনদার হিসাবে কাজ করেছেন। আমরাও প্রাণপনে চেষ্টা করেছি তাদের এই সম্মানটুকু বজায় রাখার জন্য। শুরুতে তো বাইরের তহবিল ছিল না। নিজেকেই মাঠকর্মী, হিসাবরক্ষকের কাজ করতে হত। সারাদিন মাঠে প্রচার প্রচারণার পাশাপাশি রুগি দেখা। সন্ধ্যায় ফিরে এসে ক্যাশবুক, লেজার হালনাগাদ করা।

এলাকার উৎসাহী বেকার যুবক, তালাকপ্রাপ্তা নারী, বিধবা নারী- এদেরকে সশ্রদ্ধ শ্রমের মাধ্যমেই প্রথম সংস্থার কাজ শুরু হয়। ছয় মাস তাদেরকে কোন বেতন দিতে পারিনি। নিজেরই তখন কঠিন দিন যায়। ভোরে বের হই সাইকেলে করে রুগী দেখতে। তারপর সারাদিন দশ পনেরজন রুগী দেখা শেষে হয়ত পাঁচজন সম্মানি দেয়। সেখান থেকেই মাঠকর্মীদেরকে বেতন দেওয়া শুরু করি ছয়মাস পরে। তারা গ্রামে গ্রামে গিয়ে আগ্রহী অথচ বঞ্চিত সদস্যদেরকে খুঁজে বের করতে থাকে। অনেক শিক্ষক, ব্যবসায়ীরাও অনেক সদস্যের জন্য সুপারিশ করেন। তখনকার সুপারিশ ছিল একেবারেই নিঃস্বার্থ সাদামাটা সুপারিশ। আমরা সদস্য যাচাই বাছাই করার পরে অনেককে ভর্তি করতাম। অনেককে বাদ দিতাম। তিন চারজনকে নিয়ে সমিতির যাত্রা শুরু হত। মাস ঘুরতে না ঘুরতেই অনেক সদস্য ঝরে যেত। আবার নতুন অনেকে ভর্তি হত। এভাবে সময়ের সাথে সাথে অনেক সমিতি টিকে যেত। অনেক সমিতি ভেঙে যেত। ক্লোজ মনিটরিং করতে হত কারণ ঋণের অর্থ দিয়ে কেউ যেন স্মাগলিং কিংবা মাদক ব্যবসার সাথে জড়িয়ে না যায়। আমাদের কর্মএলাকা সীমান্তবর্তী হওয়ায়, এ সমস্যাটা আমাদেরকে মোকাবিলা করতে হয় সব সময়ই। সদস্যদের সাথে আমাদের সম্পর্ক ছিল একেবারে নিখাদ সামাজিক সম্পর্ক। সমিতির একজনকে ঋণ দেওয়ার পর আরেকজনের ঋণ পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হত মাসের পর মাস। ১৯৯৭ সালে প্রথমে পিকেএসএফ-এর জনাব নাসিরুদ্দিন সাহেব, এবং পরবর্তীতে বর্তমান ডিএমডি জনাব একিউএম গোলাম মাওলা স্যার পরিদর্শনে আসলেন। তিনি আমাদেরকে কর্মী ব্যবস্থাপনা, ঋণ ব্যবস্থাপনা, রেকর্ড কিপিং-এর ব্যপারে হাতে-কলমে গাইড করেছেন। এমন অনেক পরিস্থিতি গিয়েছে, আমরা হাল ছেড়ে দিয়েছি, তিনি ঠিক সেই জায়গাতেই আশা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তারপরে  শ্রদ্ধেয় জনাব জসীমউদ্দিন স্যার (অবসর প্রাপ্ত এএমডি) পরিদর্শনে আসলেন। মানুষের সাথে আস্থার সম্পর্ক তৈরী করা এবং তা ধরে রাখার বিষয়ে তিনি আমাদের উদ্বুদ্ধ করেছেন।

পিকেএসএফ: ডিবিএস প্রতিষ্ঠার পর প্রথম বড় সাফল্য বা এমন কোনো ঘটনা যা আপনাকে বিশ্বাস জুগিয়েছিল যেএই পথেই মেহেরপুরের মানুষের ভাগ্যোন্নয়ন সম্ভব?

জনাব মো. আবু জাফর: ডিবিএস প্রতিষ্ঠার পর ছোট বড় অনেক ঘটনা ঘটেছে। ডিবিএস-এর শুরুতে আমাদের কাজ ছিল খুবই সীমিত, আর মানুষের আস্থাও তখন পুরোপুরি তৈরি হয়নি। সবার মনেই আমাদের উদ্যোগের দীর্ঘস্থায়ীতা নিয়ে আশংকা। ১৯৯৯ সালের মাঝামাঝি সম্ভবত, এমন সময়ের একটি ঘটনা আমার কাছে খুব তাৎপর্যপূর্ণ। ফতেহপুর বা শালিখার একজন কৃষক, স্বল্প জমি এবং অনিয়মিত আয়ের কারনে তিনি মহাজনী ঋণের চক্রে আটকে ছিলেন। তিনি সবজি চাষের জন্য আমাদের কাছ থেকে একটি ছোট ঋণ গ্রহণ করেন। অতিবৃষ্টিতে প্রথম দফায় সবজির ফলন আশানুরূপ হয়নি। তবে তিনি হাল ছেড়ে দেননি, আমরাও তার ওপর থেকে আস্থা হারায়নি। আমাদের কর্মীরা নিয়মিত তার সাথে যোগাযোগ রেখেছে, যতটুকু সম্ভব পরামর্শ দিয়েছে। পরবর্তী মৌসুমে তিনি নতুনভাবে আবার চেষ্টা করেন। দ্বিতীয়বার তিনি সফল হন। শুধু ঋণ পরিশোধই নয়, তিনি লাভও করতে সক্ষম হন। কিছুদিন পর তিনি নিজের জমির পাশাপাশি অন্যের জমি লিজ নিয়ে ধান চাষ শুরু করেন। একদিন তিনি নিজেই আমাদের কাছে এসে বললেন, “আমি আর শুধু নিজের জন্য কাজ করতে চাই না, আমার গ্রামের আরও দু-তিনজনকে আপনারা সুযোগ দেন, আমি তাদের পাশে থাকবো। আমি পারলে তারাও পারবে। সেদিন আমি বুঝেছি, আমাদের কাজ তখনই সত্যিকার অর্থে সফল, যখন একজন উপকারভোগী নিজেই পরিবর্তনের অংশীদার হয়ে ওঠে এবং অন্যদের জন্য পথ তৈরি করে।

পিকেএসএফ: মেহেরপুর অঞ্চলের বিশেষ ভৌগোলিক বা অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতাগুলো ডিবিএস-এর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দাঁড় করানোর ক্ষেত্রে কতটা চ্যালেঞ্জিং ছিল?

জনাব মো. আবু জাফর:  আমি একটু আগেও বলেছি, মেহেরপুরের অর্থনীতির সব থেকে শক্তিশালী দিকটাই এর সব থেকে বড় দূর্বলতা। সেটা হল স্থানীয় অর্থনীতির কৃষি নির্ভরতা। এমন কোন ফসল নেই যে এখানে হয় না। তাও খুব অল্প পরিমাণ সেচ আর নামমাত্র পরিচর্যার মাধ্যমেই। বছরে তিনটি ফসল হয় না, এমন জমি মেহেরপুরের আশেপাশে খুব কমই আছে। পার্শ্ববর্তী জেলা কুষ্টিয়াতেও বেশিরভাগ জমি তিন-ফসলি। এটা এ এলাকার ভৌগলিক আর অর্থনৈতিক শক্তি। কিন্তু, কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি আবহাওয়া নির্ভর, সময় সাপেক্ষ। তাছাড়া বাজারভিত্তিক অনেক প্রতিবন্ধকতা আছে যেমন মজুতদারী, সিন্ডিকেট ইত্যাদি। এই কারণে, মেহেরপুরের স্থানীয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি অনেক ধীর আর একঘেয়ে। স্থানীয় অর্থনীতির গতিধারা খুবই মন্থর আর এক ঘেয়ে। এই কৃষিনির্ভরতার কারণেই এখানে বৃহৎ শিল্প, কলকারখানা গড়ে ওঠেনি।  মেহেরপুর সরকারি সুদৃষ্টি একটু কমই পেয়ে এসেছে। অপ্রতুল বিনিয়োগের কারণে এখানে যোগাযোগ ব্যবস্থাও সেভাবে বেড়ে ওঠেনি। জাতীয় অর্থনীতির সাথে মেহেরপুরের অর্থনীতির মূল মাধ্যমই হল কৃষি। কিন্তু, কৃষি নির্ভর পরিবারের খরচ হয় দৈনিক কিন্তু আয় হয় ত্রৈমাসিক। এই যে আয়-ব্যায়ের মধ্যেকার যে ফাঁকটা যেখানে আমাদের কাজ করার সুযোগ ছিল। আবার কৃষির আন্তঃমৌসুমীয় যেই ফাঁকটা, সেখানে অনেক সুযোগ ছিল আমাদের কাজ করার। পরিবারের নারী সদস্যকে ঋণের অর্থ দিয়ে আমরা যদি একটা মুদি খানার দোকানের ব্যবস্থা করে দিতে পারি তাহলে তার একটা দৈনিক আয়ের ব্যবস্থা হয়ে গেল। আবার মৌসুম শেষে ফসল বিক্রি করার অর্থের কিছু অংশ দিয়ে সে আমাদের ঋণও পরিশোধ করতে পারলো। পরবর্তীতে সে আবার ঋণ নিয়ে তার স্বামীর জন্য একটা ভ্যান কিনে দিতে পারলো। পরবর্তী মৌসুমের ফসল বিক্রির অর্থ দিয়ে ঋণও পরিশোধ হয়ে গেল। এভাবেই তার মৌসুমি কৃষিকাজের পাশাপাশি দৈনিক একটা আয়ের ব্যবস্থাও হয়ে গেল।

শুনতে অনেক সহজ মনে হলেও এগুলো বাস্তবায়ন করা কঠিন ছিল। অনেকে হিসাব নিকাষ ঠিকমত না বোঝার কারণে মুদি ব্যবসায় লস গুনেছে। অনেকের ভ্যান চুরি হয়ে গিয়েছে। অনেকের স্বামী মারা গিয়েছে না হয় কঠিন রোগাক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী। সব মিলিয়ে, অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ সামনে রেখেই ডিবিএসকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া সম্ভব হয়েছে। সব থেকে বড় ইতিবাচক দিকটা আমরা যেটা মেহেরপুরে পেয়েছি সেটা হল, এখানে সিংহভাগ মানুষই নিজেদের ভিটায় বসবাস করে, নিজেদের জমি কিংবা আশেপাশের কোনপ্রতিবেশি বা আত্মীয়ের জমিতে চাষাবাদ করে। এ জন্য, ডিবিএস এর সাথে সদস্যদের একটা প্রাতিষ্ঠানিক বোঝাপড়া হতে খুব বেশি সময় নেয়নি। আরো একটা বিষয় উল্লেখযোগ্য, হ্যাঁ, একটা সময় ছিল যখন অপ্রথাগত কিছু রাজনৈতিক দলের উগ্র রাজনৈতিক চর্চা ডিবিএস-এর পথচলায় বাঁধা সৃষ্টি করেছে। সীমান্তবর্তী অঞ্চল হওয়ার কারণে অনেক উগ্রবাদী রাজনৈতিক প্রভাবও সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু, গ্রামের একেবারে গরীব খেটে খাওয়া মানুষটা যখন এসে বলেছে, এই সমিতির স্কুলে আমার বাচ্চাটা প্রতিদিন বিকালে পড়ালেখা করতে যায়- তখন ডিবিএস এর কাছে সব চ্যালেঞ্জ দূর্বা ঘাসের মত মিশে গিয়েছে মাটিতে।   

পিকেএসএফ: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে মেহেরপুর জেলা একটা ঐতিহাসিক স্থান। ১৯৭১ সাল প্রবাসী সরকারের শপথ অনুষ্ঠানের বিয়ে আপনার  কোনো স্মৃতি আছে?

জনাব মো. আবু জাফর: একেবারে বাড়ির কাছের ঘটনা। কিন্তু দূর্ভাগ্য যে, সরাসরি এই ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়নি। সেদিন সম্ভবত বল্লভপুরের আশেপাশের ছিলাম রুগি দেখার উদ্দেশ্যে। চড়া রোদ ছিল। যতদূর মনে পড়ে মেহেরপুরে তখনও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এসে পৌঁছায়নি। তবে শহরে লোক চলাচল কম ছিল। আগের দিন শুক্রবার মসজিদে কানাঘুষা শুনেছিলাম তখন ভবেরপাড়ার আমবাগানে কিছু একটা হতে পারে। বিকেলবেলা বাড়ি ফেরার পথে জেনেছিলাম সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এ এইচ এম কামারুজ্জামান এর মত কালজয়ী ব্যাক্তিবর্গের উপস্থিতিতে স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার শপথ গ্রহণ করেছে। উনারা ভারত থেকেই ভবেরপাড়ার দিকে এসেছিলেন। আসলে, সেই সময়টা একটা কঠিন সময় গিয়েছে যতদূর মনে পড়ে। যুদ্ধের বাজার, পরিবার পরিজন নিয়ে অভাব অনটন। জীবিকার তাড়নায় কখনো সক্রিয়ভাবে রাজনীতির সাথে জড়ানোর সুযোগও পাইনি। সব মিলিয়ে আমি তখন নিজের আর নিজের পরিবারের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতেই হিমশিম খাচ্ছি। এখন আফসোস হয়, এতবড় ঐতিহাসিক একটা ঘটনা ঘটে গেল আমার পাশেই অথচ আমি তার প্রত্যক্ষ সাক্ষী হতে পারলাম না।    

পিকেএসএফ: পিকেএসএফ-এর সাথে আপনাদের দীর্ঘদিনের পথচলা। ডিবিএস-এর প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি মজবুত করতে পিকেএসএফ-এর ভূমিকা আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

জনাব মোঃ আবু জাফর: পিকেএসএফ-এর সাথে আমার শুরুটা ছিল একটু অন্য রকম। সত্যি বলতে, আমি নিজেও জানতাম না যে আমি একজন উন্নয়নকর্মী হিসেবে পিকেএসএফ-এর হাত ধরে এতদূর চলে আসবো। আমি যখন প্রথম পিকেএসএফ-এর তহবিলের জন্য আবেদন করি তখন পিকেএসএফ-এর অফিস ছিল ধানমন্ডি-২৭ নাম্বারে। আবেদন করার পর প্রথম ভিজিটে আসলেন নাসিরউদ্দীন সাহেব। তখন মোটরসাইকেলের কথা চিন্তাও করিনি। বাইসাইকেলে চড়িয়ে তাকে আমাদের মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রম দেখালাম। আমার পারিবারিক অবস্থা, সামাজিক অবস্থান- সবই দেখলেন। উনার ফেরার সময় আমি শুধু বলেছিলা, ভাই, ফান্ড বা পার্টনারশিপ পাই না পাই, অন্তত এটুকু বলে যান যেই অবস্থায় এখন আছি এখান থেকে আরো ভালো করব কিভাবে? উনি বলেছিলেন, সদস্যকে ঋণ দেওয়ার পর দশবার ঘোরার থেকে ঋণ দেওয়ার আগে পাঁচবার সদস্যের বাড়িতে যান। এই একটা কথা আমি আজও আমার এরিয়া ব্যবস্থাপক, শাখা ব্যবস্থাপকদেরকে বলি।

পরবর্তীতে পিকেএসএফ-এর সহযোগী সংস্থা হিসেবে কাজ করার সুযোগ অর্জন করি যা আমার জীবনের অন্যতম এক প্রাপ্তি। পিকেএসএফ-এর ফান্ড পাই। কিন্তু, সেদিনের পর থেকে অন্য কারো কাছে ফান্ড বা দিকনির্দেশনার জন্য যেতে হয়নি। পিকেএসএফ এর অনেক অফিসার ডিবিএস-এ এসেছেন। যাদের কাছে পেশাদারিত্ব শিখেছি। দুইটা জিনিস পিকেএসএফ-এর মধ্যে পেয়েছি। প্রথমত, পিকেএসএফ এর কাছে ভুলের মার্জনা আছে কিন্তু অসততার মার্জনা নেই। ডিবিএস-এর কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দের মধ্যেও এ মূল্যবোধ প্রচলিত। আমাদের একেক শাখার জন্য পিকেএসএফ একেক রকম পরামর্শ দিয়ে থাকে যেইটা আমার কাছে অনেক বেশি বাস্তবিক মনে হয়। যেমন আগে এক এলাকায় বকেয়া পড়তে শুরু করলে আমরা ওই এলাকাভুক্ত শাখাগুলোতে যেই নীতি অনুসরণ করতাম অন্যান্য শাখাতেও ঢালাওভাবে সেই একই নীতি অনুসরণ করতে বলতাম। কিন্তু, পিকেএসএফ সবসময় পারিপার্শ্বিকতা বুঝে, সদস্যদের আয়-ব্যায়ের নমুনা বুঝে তারপর পরামর্শ দেন। কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা এলাকায় বালু শ্রমিক বেশি, রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পের শ্রমিক বেশি, পরিবহনের শ্রমিকও আছে। মানে, পেশাগত বৈচিত্র বেশি। সেই সাথে আয়ের বৈচিত্রও বেশি। আয় অনিময়তি হওয়ার কারণে তাদের মধ্যে উগ্রতাও বেশি। অন্যদিকে মেহেরপুরের শোলমারিতে ৭৮% সদস্যই কৃষির সাথে জড়িত। তারা জানে, কমবেশি যাই হোক, নিশ্চিত আয় হবে। কাজেই দুই এলাকায় আপনি ঋণ কার্যক্রম একই রকম  প্র্যাকটিস ফলো করতে গেলে ঠকবেন। পিকেএসএফ এই যে এই পরামর্শটা দিয়েছে, এইটা বাস্তবিক। পিকেএসএফ বুঝতে শিখিয়েছে, সদস্য ভালো থাকা মানে সংস্থাও ভালো থাকা। পৃথিবীর যে সব থেকে মূল্যবান জিনিসগুলা টাকা দিয়ে কিনতে পাওয়া যায় না, তার মধ্যে পিকেএসএফ এই গাইডলাইন একটা। আর এই কারণেই বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পিকেএসএফ-কে নিয়ে আমরা গর্বিত।


পিকেএসএফ: পিকেএসএফ-এর বহুমুখী কার্যক্রম/প্রকল্প মেহেরপুরের মানুষের জীবনমানের উন্নয়নে কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে?

জনাব মো. আবু জাফর: পিকেএসএফ-এর সহযোগী সংস্থা হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি প্রশিকার শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়ন কর্মসূচির সাথে কিছুদিন কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। প্রশিকার ডঃ কাজী ফারুক আহমেদ ভাই একটা কথা বলতেন, “ধন বাড়ে ঘরে, গুণ না বাড়ে মনে, সে ধন শেষে থাকে না কোন জনে।“ কথাটা কিসের প্রেক্ষিতে, কখন বলেছিলেন মনে নেই। কিন্তু যতই এই এনজিও সেক্টরে কাজ করেছি ততই অক্ষরে অক্ষরে সত্যি হতে দেখেছি। পিকেএসএফ-এর সমৃদ্ধি বা সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ফারুক ভাইয়ের সেই প্রবচনটা মনে পড়ে গেল। প্রথমে আমি নানাবিধ কারণে এই প্রকল্প নিয়ে খুব একটা আশাবাদী ছিলাম না। কারণ, আর্থিক সম্পৃক্ততা আছে এমন নৈর্ব্যাক্তিক কাজের পরিমাপ করা যায়, মনিটরিং করা যায় কিন্তু সংস্কৃতির মত এমন বিষয়গত বিমূর্ত কাজ আমি মনিটরিং করব কিভাবে? জবাব দিব কিভাবে? পরে যেটা বুঝলাম সেটা হল, সংস্কৃতির মত বিমূর্ত একটা জিনিস মনিটরিং এর প্রয়োজন নেই। বরং, সাংস্কৃতিক উন্নয়ন হলে সবার আগে সেটা মানুষের আচরণে প্রকাশ পাবে।  

পিকেএসএফ: আপনার দৃষ্টিতে ক্ষুদ্রঋণকীভাবে একজন প্রান্তিক মানুষের জীবন থেকে অভাব দূর করার স্থায়ী সমাধান হতে পারে?

জনাব মো. আবু জাফর: ক্ষুদ্রঋণ কিভাবে প্রান্তিক মানুষের জীবন থেকে অভাব দূর করবে এইটা বলার আগে তাদের আয় আর ব্যয়ের চিরাচরিত প্যাটার্নটা দেখতে হবে। কিভাবে তারা আয় করে আর কিভাবে তারা ব্যয় করে। প্রান্তিক মানুষের আয় হয় সাধারণত দুই ধরণের। প্রথমত, দৈনিক। দ্বিতীয়ত, মৌসুম ভিত্তিক। যারা দিনমজুরি করে তাদের আয় হয় প্রতিদিন। কিন্তু তাদের উদ্বৃত্ত বলতে কিছুই থাকে না। আজকের আয় আজকেই ব্যয়ের খাতায় চলে যায়। আর যারা কৃষিকাজের সাথে জড়িত, তাদের আয় হয় মৌসুমি বা সাধারণত ত্রৈমাসিক। কিন্তু তাদের ব্যয় কিন্তু হয় দৈনিক। দুই ক্ষেত্রেই কিন্তু উদ্বৃত্ত তহবিলের সংকট দেখা যাচ্ছে। এই উদ্বৃত্ত তহবিল প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী আয়ের উৎস গঠনের জন্য একটা পুঁজি হিসেবে। উদ্বৃত্ত তহবিল না থাকলে টেকসই জীবিকার উৎস গঠন প্রায় অসম্ভব। কোন দিন মজুরের এক সপ্তাহ অনেক ভালো আয় হল। সে আয়ের কিছুটা সঞ্চয় করে বাকিটা দিয়ে ভালো মন্দ খেয়ে এক সপ্তাহ কাটিয়ে দিল। পরবর্তী সপ্তাহে শুরু হল অতিবৃষ্টি। কাজ কাম নাই। ব্যস, তার যেই সঞ্চয়টা ছিল সেটা সে ভাঙতে বাধ্য হল। একই বক্তব্য মৌসুম ভিত্তিক আয়ের প্রান্তিক মানুষটার ক্ষেত্রেও খাটে। এইখানেই ক্ষুদ্রঋণের প্রাসঙ্গিকতা। ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে পাওয়া টাকাটা একজন প্রান্তিক মানুষ উতপাদনমুখী খাতে ব্যয় করে। তার নগদ প্রবাহ বৃদ্ধি পায়। সেই নগদ প্রবাহ ধরে রাখলে আস্তে আস্তে তার সম্পদ সৃষ্টি হয়। এভাবেই সে একটা নির্দিষ্ট স্থায়ী আয়ের উৎসের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে যায়। কথাগুলো মোটা দাগের মত শোনালেও এটাই কিন্তু হয়।

একজন প্রান্তিক কৃষক ঋণের টাকা দিয়ে হয় বীজ কিনছে, হয় পাওয়ার টিলার কিনছে, না হয় গরু কিনছে। মানে, এক কথায় সে ঋণের টাকাটা উৎপাদনমুখী কোন একটা খাতে ব্যয় করছে। এতে করে তার নগদ প্রবাহের ওপরে একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সে যখন এই ঋণটা পরিশোধ করে ফেলবে তখন তার সেই পাওয়ার টিলারটা কিন্তু সম্পদ হিসেবে থেকে যাবে। সে আরেক দফা ঋণ নিয়ে আবার আগের সেই নগদ প্রবাহ চক্র অনুসরণ করছে। ক্ষুদ্রঋণের অনিবার্য অনুসঙ্গ হিসেবে দরিদ্র মানুষের মধ্যে সঞ্চয়ের একটা সংস্কৃতি তৈরী হয়েছে। এই সঞ্চয়টাই এক পর্যায়ে উদ্বৃত্ত তহবিল গঠন করে তার ভাগ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে। আরেকটু নৈব্যার্ক্তিকভাবে বলতে গেলে, আপনি যখনই কাউকে ঋণ দিচ্ছেন, তারমানে তাকে পরোক্ষভাবে তার প্রতি আপনার ভরসা, আপনার আস্থাকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। সেও কিন্তু সেটা অনুধাবন করতে পারছে। একটু হলেও তার আত্মবিশ্বাস বাড়ছে। শুধু প্রান্তিক না, কেন্দ্রস্থিত মানুষের আর্থিক কিংবা মানসিক অভাব দূর করার জন্যও এই আত্মবিশ্বাসটাই সব থেকে বেশি দরকার। এইটা অনুভব করা যে কেউ না কেউ তার ওপরে ভরসা করছে- হ্যাঁ, তাকে দিয়েই হবে।     


পিকেএসএফ: মেহেরপুর অঞ্চলে কৃষি ও প্রাণিসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনে ডিবিএস-এর বিশেষ কোনো কর্মসূচি আছে কি?

জনাব মো. আবু জাফর: কৃষি আর প্রাণিসম্পদই মেহেরপুরের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি। বৃহত্তর মেহেরপুরে যেকোন উন্নয়নমূলক, উৎপাদনমুখী কাজ করতে গেলে এই দুইটাকে নিয়েই শুরু করতে হবে। প্রায় এক দশক পিকেএসএফ-এর কৃষি ইউনিটের প্রাণী সম্পদ খাতের সাথে ডিবিএস কাজ করে আসছে। পিকেএসএফ-এর সমন্বিত কৃষি ইউনিটের মাধ্যমে এই কৃষি ও প্রাণিসম্পদের উন্নয়নের মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক মুক্তি অনেকাংশেই সফল হয়েছে। কৃষি ইউনিটের আওতায় সম্পাদিত কাজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে, আমরা সংস্থার নিজস্ব অর্থায়নে দুটি প্রকল্পের কথা চিন্তা-ভাবনা করছি। আগামী অর্থবছরেই ডিবিএস-এর নিজস্ব জমিতে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।  


পিকেএসএফ: গ্রামীণ নারী ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধিতে ডিবিএস কীভাবে কাজ করে যাচ্ছে?

জনাব মো. আবু জাফর: কোন কিছুর মর্যাদা বৃদ্ধি করতে গেলে সবার আগে সেই বিষয়টার প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গীর ইতিবাচক পরিবর্তন আনা জরুরি। আমাদের বিভিন্ন কার্যক্রমের আওতায় সংগঠিত মোট সদস্যের প্রায় ৯৮%ই নারী। নারীর মর্যাদা বৃদ্ধি করতে হলে নারীর যোগ্যতার প্রতি পূর্ব থেকেই লালন করা দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের মাধ্যমে নারীকে মতামত দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া প্রয়োজন। এইটা সর্বাঙ্গীন সামাজিক-ক্ষমতায়নের প্রথম ধাপ। ডিবিএস-এ প্রাথমিকভাবে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের সাথে সম্পৃক্ত নারীদের নিয়ে খাতভত্তিক সমিতি গঠন করে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এতে করে তারা তাদের সম মনস্কা নারীদের সান্নিধ্যে আসার সুযোগ পান। নিজেদের মধ্যে আইডিয়া ভাগাভাগি করে নিতে পারেন। একটা শক্তিশালী নেটওয়ার্কের শুরু হয় এখান থেকেই। এভাবে দক্ষতা বৃদ্ধি, সামাজিক প্ল্যাটফর্ম তৈরী হতে থাকে।

সেই নারীর পরিবারের কোন পুরুষ সদস্য যখন কোন উৎপাদনমুখী খাতে বিনিয়গ করার চিন্তাভাবনা করেন তখন একবারের জন্য হলেও তিনি সেই নারীর কাছে মতামত জানতে চান। সামাজিকভাবে নারী পুরুষের আলাদা ভূমিকা থাকলেও মানুষ হিসেবে নারীরও একটা মর্যাদা আছে, অর্থনীতিতে আলাদা অবদান রাখার সক্ষমতা আছে। সামাজিক উন্নয়নমূলক যেকোন কাজ করেন, দেখবেন সেইটা কোন না কোনভাবে নারীদের উন্নয়ন ঘটাচ্ছে। আপনি শিশুদের  শিক্ষার উন্নতির জন্য কিছু একটা করবেন, দেখবেন মায়েদের আচরণের মধ্যে একটা ইতিবাচক পরিবর্তন এসে গেছে। আপনি পরিবেশগত উন্নয়নের জন্য কাজ করেন দেখবেন সেটাও কোন না কোনভাবে নারীদের উন্নয়ন ঘটাবেই। মোট কথা, তাকে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতায়ন থেকে শুরু করে তার দক্ষতা বৃদ্ধি, সমমনস্ক নারীদের সাথে তার পরিচয় করিয়ে দেওয়া, সামাজিক একটা প্ল্যাটফর্মে তাদেরকে প্রতিষ্ঠিত করা- এভাবেই ডিবিএস নারীদের মর্যাদা বৃদ্ধিতে কাজ করে যাচ্ছে। 


পিকেএসএফ: জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কৃষিতে যে পরিবর্তন আসছে, তা মোকাবিলায় আপনাদের সংস্থা কৃষকদের কী ধরনের কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে?

জনাব মো. আবু জাফর: জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব মোকাবেলায় আমরা সংগঠিত সদস্যদের সাথে নিয়ে, তিনটি ধাপ অনুসরণ করছি; সেটা হল- ঝুঁকি মোকাবেলা বা হ্রাস করা, পরিবর্তনের সাথে নিজেদেরকে অভিযোজিত করা আর উৎপাদনের ধারা অব্যাহত রাখা। স্যেভাগ্যবশত আমাদের কর্ম-এলাকায় খরা, বন্যা, লবণাক্ততার মত জলবায়ু পরিবর্তনের চরম সমস্যাগুলো কিছুটা কম। বছর ভেদে কোথাও কোথাও অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি কিংবা বন্যা দেখা যায়; কিন্তু সেগুলো সদস্যদের কৃষিকাজে তেমন নেতিবাচক প্রভাব ফেলে না। তারপরও, যেহেতু জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব সাধারণত এলাকাব্যাপী হয় না বরং পুরো পৃথিবীব্যপী হয়, তাই  জলবায়ু পরিবর্ত কারণে কৃষিতে অনিশ্চয়তা (অনিয়মিত বৃষ্টি, খরা, বন্যা, লবণাক্ততা বৃদ্ধি) মোকাবিলায় আমরা একটি climate-resilient agriculture approach অনুসরণ করার চেষ্টা করছি। প্রথমত, জলবায়ু সহনশীল (Climate-Resilient) প্রযুক্তি প্রচার। দ্বিতীয়ত, আধুনিক ও অভিযোজনযোগ্য চাষাবাদ পদ্ধতি (যেমনঃ সারি পদ্ধতিতে চাষ, মালচিং, ভাসমান কৃষি (floating agriculture) যেইটা, উঁচু বেডে সবজি চাষ ইত্যাদি) সম্পর্কে শেখানো হয় যাতে অতিবৃষ্টি বা জলাবদ্ধতার সময় তারা এইসব পদ্ধতি অনুসরণ করে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে পারে। এছাড়াও, পানি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কেও কৃষকদেরকে হাতে কলমে ধারনা দেওয়া হয়। এছাড়াও সমন্বিত প্রাণী পালন, মাটির উর্বরতা ব্যবস্থাপনা সম্পর্কেও সদস্যদেরকে আমরা জানানো চেষ্টা করি। জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সাথে নিজেদের পেশাগত দক্ষতাকে মানিয়ে নেওয়ার ব্যপারে আমরা সব সময় সব শ্রেণীপেশার সদস্যদেরকে উতসাহিত করি। আর সব সময় তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করি যেন তারা যতটা সম্ভব পরিবেশ বান্ধব উপায়ে তাদের কৃষিকাজ গুলো করতে পারেন।

পিকেএসএফ: অনেকে ক্ষুদ্রঋণকে কেবল ‘ঋণ বিতরণ’ হিসেবে দেখেন; কিন্তু ডিবিএস কীভাবে একে টেকসই উন্নয়ন ও দারিদ্র্য নিরসনের হাতিয়ার হিসেবে রূপান্তর করেছে?

জনাব মো. আবু জাফর: অনেকেই বলে ঋণ একটা ‘আর্থিক পণ্য’ বা ‘সেবা পণ্য’ কারণ এইটার বাজার মূল্য আছে, এইটা হাতবদল করা যায়, এইটা চুক্তিভিত্তিক। কিন্তু, ক্ষুদ্রঋণ জিনিসটা আমার কাছে মনে হয় একটা যাত্রা। একটা উন্নয়ন যাত্রার প্রথম ধাপ হচ্ছে ক্ষুদ্রঋণ। ডিবিএস ঋণ দেওয়ার পাশাপাশি সদস্যদেরকে সঞ্চয় করতে উদ্বুদ্ধ করে; যা দীর্ঘমেয়াদে সদস্যের আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে। একটা মানুষ একদিকে ঋণ নিয়ে ঋণ পরিশোধ করতে থাকে আর অন্য দিকে সঞ্চয়ের মাধ্যমে তার একটা উদ্বৃত্ত তহবিল তৈরী হতে থাকে, যা সে এককালীন বিনিয়োগের জন্য ব্যবহার করতে পারে। এছাড়াও, নিয়মিত মনিটরিং, বাজার সংযোগ কর্মশালা তো আছেই। সব মিলিয়ে ক্ষুদ্রঋণ আমাদের কাছে একটা চমৎকার উন্নয়মুখী যাত্রা। আমাদের সদস্যকেও আমরা এটা বোঝাই যে ঋণ কোন বোঝা যা এইটা একটা সুযোগ। সবাই এই সুযোগ পায় না। আপনি পাচ্ছেন কারণ আমরা আপনার ভেতরে সম্ভাবনা খুঁজে পেয়েছি। আমাদের অনেক পুরাতন সদস্য আছেন যারা নিজেদের দক্ষতা বৃদ্ধি করে নিজের ব্যবসা করছেন, পাশাপাশি অন্যান্য ব্যবসায় বিনিয়োগও করছেন। উদ্যোক্তা হিসেবে তাদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাও ক্রমশ বাড়ছে।    

পিকেএসএফ: ক্ষুদ্রঋণের সুদের হার অত্যাধিক বলে অনেক মনে করে থাকে, এ বিষয়ে আপনার মতামত কি?

জনাব মো. আবু জাফর: মনে করাটা একেবারে অমূলক না। তবে, কথাটা ‘অত্যাধিক’ না হয়ে ‘তুলনামূলকভাবে অধিক’ বললে বেশি যুক্তিযুক্ত হবে। কথাটা প্রাসঙ্গিক আর কাঠামোগত দুইটা দিক আছে। দুইভাবেই যদি আমরা দেখি তাহলে ভালো হয়। কারণ, যখনই আমরা কোন কিছু ‘অত্যাধিক বেশি বা অত্যাধিক কম’ বলি সেটা কোন কিছুর সাপেক্ষেই বলি। যেটার সাপেক্ষে বলি সেটা পরিষ্কার করা উচিত। প্রথমত, ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমে পরিচালনা ব্যয় অনেক। প্রতিটি ঋণের জন্য বেশ কয়েকবার ফিল্ড ভিজিট করতে হচ্ছে। একেবারে তৃণমূল পর্যায়ে গিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে হচ্ছে যেটা সময় সাপেক্ষ, শ্রম সাপেক্ষ। সব মিলিয়ে High-touch delivery মডেলের কারণে এখানে ঋণপ্রতি পরিচালনা ব্যয় অনেক বেশি। কারণ এখানে প্রত্যেকটা সদস্যের ব্যক্তিগত সেবাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তার সাথে সরাসরি যোগাযোগ করা হচ্ছে। তার প্রয়োজন অনুযায়ী ঋণের পরিমাণ, মেয়াদ সাজিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এক কথায় ‘ঋণ’ নামক অর্থসেবা পাওয়ার পাশাপাশি সে কারিগরি সুযোগ সুবিধা, পর্যায়ভিত্তিক পর্যবেক্ষণ-এর মত গ্রাহক পরিসেবাগুলোও পাচ্ছে। এই দিক থেকে দেখতে গেলে এই সুদের হার কিছুটা বেশি হওয়া অযৌক্তিক না। তাছাড়া, একেবারে জামানতবিহীন ঋণ হওয়ার কারণে উচ্চমাত্রার একটা ঝুঁকি তো আছেই। তাছাড়া, সুদের হার কম না বেশি তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হল সুদের হারের তুলনায় ঋণটা গ্রাহক পর্যায়ে কতটা পরিবর্তন আনতে পারছে? যেই পরিবর্তনটা আনছে সেইটা কি সুদের হারের প্রেক্ষিতে যৌক্তিক? সেই পরিবর্তনটা কি দীর্ঘস্থায়ী?

তবে, গ্রাহকদের অবস্থা আর ঋণের আকারের প্রেক্ষিতে ক্ষুদ্রঋণে সুদের হার পর্যালোচনা করা উচিত। যদিও সংস্থা পর্যায়ে পরিচালন ব্যয়, দীর্ঘমেয়াদী ঋণ ক্ষয় সঞ্চিতি ইত্যাদি কমিয়ে আনতে পারলে সুদের হারও কমানোর সুযোগ আছে বলে আমি মনে করি, তবে সেখানেও নীতিগত সিদ্ধান্তের কিছু ব্যপার আছে। আমরা তৃণমূল পর্যায়ের মানুষ ইচ্ছা করলেই সব কিছু করতে পারি না। সব মিলিয়ে, আমার মতামত, ক্ষুদ্রঋণের সুদের হারে বেশি না কম- এটা আপেক্ষিক ব্যাপার। নির্দিষ্ট কিছু নিয়ামকের প্রেক্ষিত ছাড়া মোটা দাগে বলা সম্ভব না।  

পিকেএসএফ: একজন চিকিৎসক এবং একইসাথে একজন সফল সংগঠক হিসেবে আপনার নেতৃত্বের মূলমন্ত্র কী?

জনাব মো. আবু জাফর: নেতৃত্বের মূলমন্ত্র সব জায়গাতে একটাই। সে চিকিৎসক হিসেবেই বলি আর একজন সফল সংগঠক হিসেবেই বলি। সেটা হল- সফল নেতা সে-ই যে সফল উত্তরসুরি বা আরেকজন সফল নেতা তৈরী করতে পারে। যেই উত্তরসুরী পরবর্তীতে নিজের স্বকীয়তা বজায় রেখে নিজের মেধা ও মননের ওপরে নির্ভর করে প্রভাবমুক্ত থেকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। যেকোন পরিস্থিতিতে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবে কিন্তু নিজের স্বকীয়তা বজায় রেখে। আমার মনে হয় এই অভিযোজনিক বৈশিষ্ট্য যেকোন ক্ষেত্রেই অনেক গুরুত্বপূর্ণ। জীবন অব্যাকরণিক। জীবন একরৈখিক বা একপাক্ষিক না। অন্তত আমি সেরকম জীবন পাইনি। অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে পরিবার নিয়ে, সংস্থা নিয়ে। মাঠে মাঠকর্মীরা বসে থেকেছে আর আমার নির্ঘুম রাত কেটেছে। প্রতিটা ক্ষেত্রে বুঝেছি, আজকে আমি যেটাকে বেদবাক্য বলে মানছি কাল মাঠপর্যায়ে গিয়ে সেটা একেবারেই অবাঞ্ছিত হবে না তার কোন নিশ্চয়তা নেই। কারণ, আমি যেই ক্ষুদ্রঋণ সেক্টর দেখে যাচ্ছি, রেখে যাচ্ছি- সেই ক্ষুদ্রঋণ আমার পরবর্তী উত্তরসুরী হুবহু সেইভাবেই পাবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই। চিকিৎসক হিসেবে বলি আর সংগঠক হিসেবেই বলি- পরিস্থিতি অনেক বড় শিক্ষক। পরিস্থিতিই শিখিয়ে দেয় পরবর্তী পরিস্থিতিতে কি করা উচিত।     


পিকেএসএফ: দীর্ঘ পথচলায় ডিবিএস-এর সবচেয়ে বড় অর্জন বা সার্থকতা কোনটি বলে আপনি মনে করেন?

জনাব মো. আবু জাফর: ডিবিএস-এর সব থেকে বড় অর্জন বা সার্থকতাকে পরিমাপ করার মত কোন নির্দিষ্ট  পরিসংখ্যান বা মাপকাঠি আমি দেখি না। প্রতিষ্ঠান হিসেবে ডিবিএস বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ছোট বড় অনেক পুরস্কার পেয়েছে। কিন্তু দিন শেষে সেগুলো তৃতীয় পক্ষের একটা স্বীকৃতি মাত্র। প্রতিষ্ঠান হিসেবে ডিবিএস-এর সব থেকে বড় প্রাপ্তি, -ডিবিএস তার সদস্যের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পেরেছে। সদস্যের উতপানশীলতার অংশীদার হতে পেরেছে। ডিবিএস-এর আলুকদিয়া শাখার RAISE প্রকল্পের আওতাধীন একজন সদস্য কাঠের আসবাবপত্র বানানোর মাঝারি আকারের একটা ওয়ার্কশপ স্থাপন করেছে; সেই ওয়ার্কশপ অর্থনীতিতে যে ইতিবাচক প্রভাবটা ফেলবে, ডিবিএস সেই ইতিবাচকতার একজন ক্ষুদ্র ভাগিদার। এই ভাগিদার হওয়াটাই ডিবিএস এর জন্য গর্বের। এই যে ব্যাক্তিজীবন থেকে শুরু করে বৃহত্তর অর্থনীতিতে ইতিবাচক যে পরিবর্তন- এটাই ডিবিএস এর সব থেকে বড় স্বার্থকতা। গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীরা এখন শুধু বোঝা নয় বরং উল্লেখযোগ্য অবদানকারী। তৃণমূল পর্যায়ে একজন বেকার যুবক ঋণ নিয়ে সেলুন খুলেছে তার সফলতার কারণ হতে পারাটা ডিবিএস-এর অনেক বড় অর্জন। আর এইসব ইতিবাচক পরিবর্তনই ডিবিএস-এর সার্থকতা। আর চিকিৎসক জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকেই বলছি, জীবনের সব থেকে বড় অর্জনগুলো কখনো কোন সংখ্যা বা পরিসংখ্যান দিয়ে পরিমাপযোগ্য না।


পিকেএসএফ: মেহেরপুরের মানুষের জন্য আপনার বিশেষ কোনো স্বপ্ন যা এখনো পূরণ হওয়া বাকি আছে?

জনাব মো. আবু জাফর: আমি আমার জীবনে যা স্বপ্ন দেখেছি তা বাস্তবায়িত হয়েছে। কিছু স্বপ্ন পুরোটা বাস্তবায়িত হয়েছে। আর কিছু আংশিক। তবে, অপূর্ণ স্বপ্ন আমার জীবনে নেই বললেই চলে। প্রতিটা স্বপ্নই ছিল সামষ্টিক অর্থে কল্যাণকর। অন্যান্য নাগরিক সুযোগ সুবিধার মধ্যে সব থেকে অপ্রতুল এখানকার চিকিৎসা ব্যবস্থা। সরকারি হাসপাতালে সামান্য প্রাথমিক সেবা পেতেই মানুষকে হিমশিম খেতে হয়। এইসব অপ্রতুলতা আমাকে এমন একটা মেডিকেল ইন্সটিটিউটের স্বপ্ন দেখিয়েছে যেখানে গরীব, অসহায় মানুষেরা নামমাত্র সেবামূল্যে চিকিৎসা সেবা পাবে। জরুরি মূহুর্তে কাউকে আর কুষ্টিয়া কিংবা রাজশাহী ছুটে বেড়াতে হবে না। যেখানে দেশ থেকে শুরু করে বিদেশের বড় বড় বিশেষজ্ঞ ডাক্তারেরা আসবেন। সেবা দেবেন। নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করার সুযোগ পাবেন। এমন একটা সেবামূলক প্রতিষ্ঠান যেখানে সেবার পাশাপাশি মেধাবী শিক্ষার্থীরা এখানে পড়তে আসবে। মেডিকেল সায়েন্সের ওপর গবেষণা করার সুযোগ পাবে। সব প্রতিকূলতা ছাপিয়া এমন একটা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে, যেখানে সেবাকে ব্যবসা নয়, বরং ব্যবসাকে সেবায় রূপান্তরিত করা হবে।

আমাদের ডিবিএস এর নিজস্ব জমি আছে প্রায় নয় একর। হয়ত পরবর্তী কোন প্রজন্ম আমার এই স্বপ্ন পূরণ করবে। হয়ত আমি দেখে যেতে পারব না। কিন্তু, অন্যান্য স্বপ্নকাতর মানুষের মত আমিও আমার এই স্বপ্নের মাধ্যমেই বেঁচে থাকবো আজীবন। এমন এক স্বপ্ন, যেই স্বপ্ন শুধু মেহেরপুর না, হয়ত একদিন পুরো বাংলাদেশের ভাগ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।  


পিকেএসএফ: আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়ন বা স্মার্টসেবা প্রদানে আপনাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

জনাব মো. আবু জাফর: প্রথমত বলব, ডিজিটাল ফাইনান্সিয়াল সিস্টেম বা DFS এর কথা। এটা আমাদের অনেকদিনের পরিকল্পনা। এমন একটা প্ল্যাটফর্ম, যেখানে সদস্যরা নির্দ্বিধায় মোবাইল ব্যাংকিং, ডিজিটাল লেনদেন, ক্যাশলেস কালেকসন সিস্টেম সুবিধা ব্যবহার করতে পারবে। যদিও, অন সাইট মনিটরিং-এর কোন বিকল্প নেই। তারপরও, ডিজিটাল ফাইনান্সিয়াল সিস্টেমের পাশাপাশি আমরা যদি একটা ডিজিটাল মনিটরিং সিস্টেম রাখতে পারি যেটার মাধ্যমে আমরা অন্তত একটা পরিসংখ্যান দেখতে পাব। কোন এরিয়ায় বকেয়া কোন সময়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বছরের কোন সময়ে কোন এরিয়ায় বা কোন শাখায় অগ্রীম আদায় হচ্ছে বা সঞ্চয় দিয়ে ঋণ সমন্বয় হচ্ছে। মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে, আমরা কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সাইকোমেট্রিক প্রোফাইলিং করার চিন্তা ভাবনাও করছি। বর্তমানে এটা ফাইল রেটিং করার মাধ্যমে ম্যানুয়ালি করে থাকি। তবে ডিজিটালি হলে কাজটা আরো সহজ হবে বলে আশা করছি। তবে ঋণ কার্যক্রমের ব্যপারে যেগুলো বললাম সেগুলো আমাদের বর্তমানে ব্যবহৃত সফটওয়্যারের মাধ্যমেই করতে পারি। ভবিষ্যতে এগুলো আমাদের কর্ম-পরিকল্পনা ঠিক করতে কাজে লাগবে।

বর্তমানে আমরা খাতভিত্তিক ঋণ কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়ে কাজ করছি। কোন খাতে ঋণ খেলাপি বেশি হচ্ছে, কোন খাতে কম হচ্ছে, কোন খাতে সঞ্চয়ী সদস্য বেশি- যদিও এগুলো ঋণ ব্যবস্থা পোর্টফোলিওর একেবারে সঠিক চিত্র তুলে ধরবে না কিন্তু একটা ধারণা পাওয়া যাবে যার; ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া যাবে।


পিকেএসএফ: আপনাদের সংস্থাসহ অন্যান্য সংস্থায় কর্মরত উন্নয়নকর্মী এবং যারা বর্তমানে জনসেবায় যুক্ত হতে চান, সেই তরুণদের উদ্দেশ্যে আপনার উপদেশ কী?

জনাব মো. আবু জাফর: জনসেবা হোক আর যেকোন ধরণের উন্নয়নভিত্তিক কার্যক্রমই হোক- নিজের দক্ষতা বৃদ্ধি করুন। নিজের উপযোগীতা সৃষ্টি করুন। নিজের প্রাসঙ্গিকতা সৃষ্টি করুন। আপনি যদি বড় কোন প্রতিষ্ঠানের উচ্চতর পদে থাকতেন, তাহলে আপনি কি নিজেকে চাকুরি দিতেন? নিজেকে প্রতিনিয়ত এই ধরণের প্রশ্নের মুখোমুখি করুন, দেখবেন চাকুরির প্রতি আপনার দৃষ্টিভঙ্গীই বদলে যাবে।

পিকেএসএফ: আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আপনার সুস্বাস্থ্য কামনা করছি।

জনাব মো. আবু জাফর: আপনাকে এবং পিকেএসএফ-কে অসংখ্য ধন্যবাদ। সম্প্রতি ‘স্বাধীনতা পদক ২০২৬’ অর্জন করায় পিকেএসএফ-এর সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অভিনন্দন। পিকেএসএফ-এর সহযোগী সংস্থা হিসেবে আমরাও এ অর্জনে সমান আনন্দিত।